তারেক রহমানের সামনে ইতিহাসের পরীক্ষা: নেতৃত্ব, সততা ও এশিয়ায় বাংলাদেশের নতুন গুরুত্ব


নিউজ ডেক্স প্রকাশের সময় : অগাস্ট ২৯, ২০২৬, ১:৩৪ অপরাহ্ন
তারেক রহমানের সামনে ইতিহাসের পরীক্ষা: নেতৃত্ব, সততা ও এশিয়ায় বাংলাদেশের নতুন গুরুত্ব

বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার ছয় মাস পার করেছেন। এই সময়ের মধ্যে দেশে একটি নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, রাজনৈতিক অস্থিরতার একটি পর্যায় পেরিয়ে কিছুটা স্থিতিশীলতা ফিরেছে, আবার অর্থনীতি, জ্বালানি, প্রশাসন এবং সুশাসনের মতো বড় চ্যালেঞ্জগুলোও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক মন্ত্রিসভা পুনর্গঠন থেকে বোঝা যায়, সরকার নিজেও প্রশাসনিক কার্যকারিতা এবং রাজনৈতিক ভারসাম্যের প্রয়োজন অনুভব করছে।

কিন্তু আমার দৃষ্টিতে তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা শুরুই হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি কতটা জনপ্রিয়—এটাই মূল প্রশ্ন নয়। বড় প্রশ্ন হচ্ছে, তিনি কাদের নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন এবং তাঁর চারপাশে কী ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।

একজন প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে সৎ, দেশপ্রেমিক বা উন্নয়নমুখী হলেও তাঁর চারপাশের মন্ত্রী, এমপি, দলীয় নেতা, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তারা যদি ক্ষমতাকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করেন, তাহলে শেষ পর্যন্ত দায় প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের ওপরই এসে পড়ে।

তাই আজ থেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করতে হবে—তারেক রহমানের চারপাশে কি সত্যিকারের যোগ্য, স্বাধীনচেতা ও সৎ নেতৃত্ব তৈরি হচ্ছে, নাকি ধীরে ধীরে এমন একটি বলয় তৈরি হবে যেখানে সবাই শুধু প্রধানমন্ত্রীকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করবে?

নেতার সবচেয়ে বড় বিপদ বিরোধী দল নয়

দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির ইতিহাস আমাদের একটি কঠিন শিক্ষা দেয়। একজন শক্তিশালী নেতার সবচেয়ে বড় বিপদ সবসময় বিরোধী দল নয়। অনেক সময় সবচেয়ে বড় বিপদ আসে নিজের চারপাশের লোকজনের কাছ থেকে।

ক্ষমতা আসার পর সরকারি নিয়োগ, টেন্ডার, ব্যবসায়িক সুবিধা, প্রশাসনিক প্রভাব এবং রাজনৈতিক পদ-পদবিকে ঘিরে স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

বাংলাদেশের জনগণ অতীতে এই সংস্কৃতির মূল্য বহুবার দিয়েছে।

সুতরাং তারেক রহমানের সামনে এখন একটি ঐতিহাসিক সুযোগ রয়েছে—তিনি চাইলে এমন একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন যেখানে দলীয় পরিচয় কাউকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখবে না।

মন্ত্রী হোক, এমপি হোক, ব্যবসায়ী হোক কিংবা প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক সহযোগী—কারও বিরুদ্ধে বিশ্বাসযোগ্য দুর্নীতির অভিযোগ উঠলে স্বাধীন তদন্ত হওয়া উচিত। সরকারপক্ষ সম্প্রতি দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছে; এই নীতি বাস্তবে কতটা নিরপেক্ষভাবে প্রয়োগ হয়, সেটিই হবে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।

অন্ধ আনুগত্য নয়, সত্য বলার মানুষ প্রয়োজন

প্রধানমন্ত্রীর চারপাশে শুধু অনুগত মানুষ থাকলে সেটি শক্তির চিহ্ন নয়; বরং অনেক সময় দুর্বল শাসনের শুরু।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রয়োজন এমন মন্ত্রী, উপদেষ্টা ও কর্মকর্তা যারা প্রয়োজনে তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারবেন—

“মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, এই সিদ্ধান্তটি সঠিক নয়।”

যে নেতা সমালোচনা শুনতে পারেন, তিনিই দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী নেতা হতে পারেন।

তারেক রহমান ইতোমধ্যে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন এনেছেন এবং নতুন কয়েকজনকে দায়িত্ব দিয়েছেন। এটিকে শুধু রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস হিসেবে না দেখে প্রশাসনিক কর্মদক্ষতার একটি পরীক্ষা হিসেবেও দেখা যেতে পারে।

বাংলাদেশকে আর ছোট রাষ্ট্র হিসেবে দেখার সুযোগ নেই

বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের গুরুত্ব এখন শুধু দেশের অভ্যন্তরে সীমাবদ্ধ নয়।

প্রায় ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগরীয় অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থান সরাসরি যুক্ত।

একদিকে ভারত, অন্যদিকে চীন; একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান, সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান—প্রত্যেকেই বাংলাদেশকে নিজেদের বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের আলোচনা চলছে, যদিও শেখ হাসিনাকে ঘিরে দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন এখনো রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য একটি “অনুকূল পরিবেশ”-এর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

অন্যদিকে বাংলাদেশকে নতুন আঞ্চলিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় যুক্ত করার প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানকে কেন্দ্র করে প্রস্তাবিত ‘Mecca Pact’-এ বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা দেশের পররাষ্ট্রনীতিকে নতুন পরীক্ষার সামনে দাঁড় করিয়েছে।

এখানেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের উচিত হবে না ভারতবিরোধী হয়ে চীনের দিকে যাওয়া, কিংবা চীনবিরোধী হয়ে ভারতের দিকে যাওয়া। একইভাবে কোনো সামরিক বা রাজনৈতিক বলয়ের স্থায়ী অনুসারী হয়ে পড়াও দেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূলনীতি হওয়া উচিত—

Bangladesh First.

অর্থাৎ যেটি বাংলাদেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, বাণিজ্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সবচেয়ে ভালো—সেই সিদ্ধান্তই নিতে হবে।

তারেক রহমান কি একজন গুরুত্বপূর্ণ এশীয় নেতা হয়ে উঠতে পারবেন?

আমার বিশ্বাস, সম্ভাবনা রয়েছে।

কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ নেতা হতে শুধু প্রধানমন্ত্রী হওয়া যথেষ্ট নয়।

একজন এশীয় নেতা তখনই গুরুত্ব পান যখন তাঁর দেশ রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী, আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বাসযোগ্য এবং অভ্যন্তরীণভাবে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়।

বাংলাদেশ যদি আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরে অবকাঠামো, শিক্ষা, শিল্প, প্রযুক্তি, সমুদ্রবন্দর, জ্বালানি এবং দক্ষ মানবসম্পদে বড় অগ্রগতি করতে পারে, তাহলে দেশটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সংযোগস্থলে পরিণত হতে পারে।

২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বাংলাদেশ এখনো তার নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং সংস্কারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পর্যায়ে রয়েছে। অনেক সংস্কার ইতোমধ্যে আইনি কাঠামোয় এসেছে, কিন্তু কর্মসংস্থান, বৈষম্য এবং প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করার কাজ এখনো অসম্পূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রীকে দল ও রাষ্ট্রের মধ্যে পার্থক্য করতে হবে

এখানেই তারেক রহমানের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক পরীক্ষা।

তিনি বিএনপির চেয়ারম্যান হতে পারেন, কিন্তু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি শুধু বিএনপির প্রধানমন্ত্রী নন।

তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থক, জামায়াত সমর্থক, এনসিপি সমর্থক, সংখ্যালঘু, ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, প্রবাসী—সব নাগরিকের প্রধানমন্ত্রী।

একটি পরিণত রাষ্ট্রে সরকার এবং রাজনৈতিক দল এক বিষয় নয়।

সরকারি প্রশাসনকে দলীয় সংগঠনের সম্প্রসারণে পরিণত করা হলে শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয় এবং দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে পরীক্ষাটি নিজের ঘর থেকেই শুরু করতে হবে

আগামী দিনে যদি তারেক রহমান দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে চান, তাহলে তাঁর সবচেয়ে বড় বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি হবে যখন তিনি নিজ দলের মানুষদের বিরুদ্ধেও একই আইন প্রয়োগ করবেন।

বিরোধী দলের দুর্নীতির তদন্ত করা সহজ।

নিজ দলের প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে তদন্ত অনুমোদন করা কঠিন।

কিন্তু ইতিহাস কঠিন সিদ্ধান্তগুলোকেই মনে রাখে।

বাংলাদেশের সামনে বিরল সুযোগ

বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।

একদিকে পরিবর্তিত এশীয় ভূরাজনীতি, অন্যদিকে বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী, উৎপাদনশীল অর্থনীতি, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত অবস্থান এবং বৈশ্বিক প্রবাসী বাংলাদেশিদের শক্তি—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের সামনে বিরল সুযোগ তৈরি হয়েছে।

এই সুযোগের সদ্ব্যবহার হলে আগামী এক দশকে বাংলাদেশ শুধু দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ নয়, বরং এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ মধ্যম শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে।

কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী ব্যক্তি নয়—শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান।

প্রয়োজন একজন প্রধানমন্ত্রীকে ঘিরে হাজারো প্রশংসাকারী নয়—প্রয়োজন সত্য বলার সাহসী মানুষ।

প্রয়োজন প্রতিহিংসার রাজনীতি নয়—আইনের শাসন।

আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন এমন একটি সংস্কৃতি, যেখানে ক্ষমতা ব্যক্তিগত সম্পদ তৈরির পথ নয়, বরং জনগণের সেবা করার দায়িত্ব।

তারেক রহমানের সামনে সেই সুযোগ এখন উপস্থিত।

তিনি কি আরেকজন প্রচলিত দক্ষিণ এশীয় প্রধানমন্ত্রী হয়ে থাকবেন, নাকি এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি করবেন যেখানে তাঁর নিজের লোকেরাও আইনের ঊর্ধ্বে থাকবে না?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে তাঁর রাজনৈতিক উত্তরাধিকার—এবং সম্ভবত বাংলাদেশের আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎও।

কামরুল ইসলাম
প্রধান সম্পাদক
AusBangla News

ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন: