ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাব: শিশুদের জীবন রক্ষায় দ্রুত টিকাদানের আহ্বান


নিউজ ডেক্স প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৬, ১১:৫২ পূর্বাহ্ন
ভয়াবহ হাম প্রাদুর্ভাব: শিশুদের জীবন রক্ষায় দ্রুত টিকাদানের আহ্বান

বাংলাদেশে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে হাম বা measles-এর প্রাদুর্ভাব। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে দেশজুড়ে এক লাখ ৬৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৯ হাজার ৮৩৫টি সংক্রমণ পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হয়েছে।

এই প্রাদুর্ভাবের সঙ্গে ৯৯৯টি সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মৃত্যু যুক্ত বলে ৯ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়। এর মধ্যে ১০০টি মৃত্যুকে পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সংখ্যাগুলো সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত ঘটনা মিলিয়ে প্রকাশিত হওয়ায় এগুলোকে চূড়ান্ত চিকিৎসাবিষয়ক হিসাব হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে শিশুরা

পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, টিকা না পাওয়া বা নির্ধারিত ডোজ সম্পন্ন না করা শিশু এবং নিয়মিত টিকা গ্রহণের বয়সে না পৌঁছানো নবজাতকেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

হাম অত্যন্ত সংক্রামক একটি ভাইরাসজনিত রোগ। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি, হাঁচি ও শ্বাসপ্রশ্বাসের মাধ্যমে এটি ছড়াতে পারে। জনসংখ্যার অন্তত ৯৫ শতাংশকে প্রয়োজনীয় টিকার আওতায় না আনলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।

টিকাদানে ঘাটতি কেন তৈরি হলো?

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে বাধা, সময়মতো টিকা সংগ্রহে সমস্যা এবং ২০২৪–২৫ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অনেক শিশু নির্ধারিত ডোজ থেকে বাদ পড়ে যায়।

শিশুদের নিয়মিত টিকাদানের হার ২০২৪ সালের ৯৩ শতাংশ থেকে ২০২৫ সালে ৮৬ শতাংশে নেমে আসার তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে। এই সামান্য মনে হওয়া পতন বিপুলসংখ্যক শিশুকে সংক্রমণের ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে।

হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে চাপ

হাম রোগীদের পাশাপাশি ডেঙ্গু আক্রান্তদেরও চিকিৎসা দিতে গিয়ে বিভিন্ন হাসপাতাল অতিরিক্ত চাপের মুখে পড়েছে। শিশু রোগীর শয্যা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম এবং শিশুর জন্য উপযোগী স্যালাইনসহ কিছু চিকিৎসাসামগ্রীর সংকটের খবর পাওয়া গেছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুসারে, এক লাখ ৪৬ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে। গুরুতর রোগীদের মধ্যে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ, পানিশূন্যতা এবং শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতা দেখা দিতে পারে।

দেশব্যাপী জরুরি টিকাদান কার্যক্রম

সরকার WHO, UNICEF ও Gavi-এর সহযোগিতায় ৫ এপ্রিল উচ্চঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি উপজেলায় জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান শুরু করে। পরে কার্যক্রমটি সিটি করপোরেশন ও দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করা হয়।

এই কর্মসূচিতে ছয় মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের আগের টিকাদানের অবস্থা বিবেচনা না করেই বিনা মূল্যে অতিরিক্ত হাম-রুবেলা টিকা দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। প্রায় দুই কোটি শিশুকে সুরক্ষার আওতায় আনার লক্ষ্যে কার্যক্রম পরিচালিত হয়।

কোন লক্ষণগুলোতে সতর্ক হতে হবে?

হামের সম্ভাব্য লক্ষণের মধ্যে রয়েছে:

  • জ্বর;
  • কাশি ও নাক দিয়ে পানি পড়া;
  • চোখ লাল হওয়া;
  • মুখ ও শরীরে লালচে ফুসকুড়ি;
  • শ্বাসকষ্ট বা শিশুর অস্বাভাবিক দুর্বলতা।

এসব লক্ষণ দেখা দিলে শিশুকে স্কুল, ডে-কেয়ার বা জনসমাগমে না পাঠিয়ে দ্রুত নিকটস্থ সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বা চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। গুরুতর অসুস্থতা, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি বা পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।

নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক বা স্থানীয় দোকানের ওষুধ দিয়ে চিকিৎসার চেষ্টা না করার পরামর্শ দিয়েছেন স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা।

হাম প্রতিরোধযোগ্য রোগ। তাই আতঙ্ক নয়—সঠিক তথ্য, সময়মতো টিকা এবং সন্দেহভাজন রোগীকে দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনাই শিশুদের জীবন রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর পথ।

ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন: