

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে প্রথমবারের মতো ভাষণ দিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশের অর্থনীতি, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক কাঠামো পুনর্গঠনের জন্য সরকারের ‘3-R Strategy’ তুলে ধরেছেন। এই তিনটি ‘R’ হলো—Recovery, Restoration এবং Reconstruction।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের লক্ষ্য সামনে রেখে এই তিন ধাপের কৌশল বাস্তবায়ন করছে। দেশের অতীত রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি বিভিন্ন সমালোচনামূলক বক্তব্যও দেন; এগুলো প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব রাজনৈতিক মূল্যায়ন হিসেবে ভাষণে উপস্থাপিত হয়।
Recovery — অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানো ও কর্মসংস্থান
‘Recovery’ অংশে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং তরুণ জনগোষ্ঠীর দক্ষতা উন্নয়নে।
সরকার বাংলাদেশের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর এবং দেশকে একটি manufacturing hub হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে। তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের স্টার্টআপ কার্যক্রমে সহায়তার জন্য চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দের কথাও প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন।
দ্বিতীয় ‘R’—Restoration—এর আওতায় রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু নির্বাচনী গণতন্ত্র নয়; অর্থনীতির সুযোগ-সুবিধাও যেন দেশের বিভিন্ন শ্রেণি ও পরিবারের কাছে পৌঁছায়। সামাজিক সুরক্ষার অংশ হিসেবে সরকার Family Card, Farmers’ Card, Sports Card এবং e-Health Card-এর মতো কর্মসূচির কথা তুলে ধরেছে।
নারীদের শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার কথাও ভাষণে বলা হয়। সরকার নারীদের জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো এবং স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষার সুযোগ দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে।
তৃতীয় ‘R’—Reconstruction—এর লক্ষ্য দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামোকে নতুনভাবে গড়ে তোলা।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, অবকাঠামো, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও বিনিয়োগকে এ ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে শিক্ষা খাতে ব্যয় ধীরে ধীরে জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনার কথাও ভাষণে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দিয়ে কর্মমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ও গবেষণায় প্রবেশাধিকার বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বৈশ্বিক বিকাশ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করেন যে বর্তমানের digital divide যেন ভবিষ্যতে AI divide-এ রূপ না নেয়। উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তিতে সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য শুধু ‘3-R’ পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ ছিল না। রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, ফিলিস্তিন পরিস্থিতি, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং বৈশ্বিক সংঘাতের বিষয়ও উঠে আসে।
বাংলাদেশে আশ্রিত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা চান তিনি। জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য জলবায়ু অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তা বাড়ানোরও আহ্বান জানান।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম সাধারণ পরিষদের এবারের প্রতিপাদ্য “Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations That Delivers for All”। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান এই অধিবেশনের সাধারণ পরিষদের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
ভাষণের শেষ দিকে প্রধানমন্ত্রী একটি সমৃদ্ধ, নিরাপদ ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য তুলে ধরে সরকারের রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে “Bangladesh First: Bangladesh for All” স্লোগানটি পুনর্ব্যক্ত করেন।
জাতিসংঘের মঞ্চে উপস্থাপিত ‘3-R’ পরিকল্পনা এখন বাস্তবায়নের পর্যায়ে কতটা অগ্রগতি অর্জন করে, তা দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও সামাজিক সুরক্ষা খাতের ভবিষ্যৎ গতিপথে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।












































আপনার মতামত লিখুন :