

সংখ্যায় বাড়ছে বাংলাদেশি কমিউনিটি, কিন্তু কর্মসংস্থান, দক্ষতার স্বীকৃতি, স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নেতৃত্বের বিভাজন এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশি কমিউনিটি এখন আর ছোট বা অদৃশ্য কোনো জনগোষ্ঠী নয়। অস্ট্রেলিয়ান ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের সর্বশেষ প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩০ জুন দেশটিতে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৮৪ হাজার ৮৮০ জনে পৌঁছেছে। অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সন্তানদের অন্তর্ভুক্ত করলে কমিউনিটির প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।
২০২১ সালের আদমশুমারিতে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী মানুষের সংখ্যা ছিল ৫১ হাজার ৪৯১। অর্থাৎ কয়েক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর আকার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। শিক্ষা, দক্ষ অভিবাসন, পরিবার পুনর্মিলন এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আগমনের কারণে এই প্রবৃদ্ধি ঘটছে।
নাগরিকত্ব ও অভিবাসন অবস্থান
২০২১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া অস্ট্রেলীয় বাসিন্দাদের ৬৭ শতাংশ অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক ছিলেন। বাকি ৩২ দশমিক ৭ শতাংশের মধ্যে স্থায়ী বাসিন্দা, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, অস্থায়ী গ্র্যাজুয়েট, দক্ষ কর্মী এবং অন্যান্য ভিসাধারী অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।
অস্ট্রেলিয়া এখন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অন্যতম প্রধান গন্তব্য। সরকারি শিক্ষা তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ২৭ হাজার ২১১ জন বাংলাদেশি শিক্ষার্থী অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা শুরু করেছেন অথবা পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন। তবে শিক্ষার্থীদের এই সংখ্যা মোট জনসংখ্যার সঙ্গে আলাদাভাবে যোগ করা যাবে না, কারণ তাঁদের একটি বড় অংশ জনসংখ্যার হিসাবেও অন্তর্ভুক্ত রয়েছেন।
সূত্র: Australian Department of Education
উচ্চশিক্ষায় বিস্ময়কর সাফল্য
অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশি কমিউনিটির সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে শিক্ষা। ২০২১ সালের আদমশুমারির তথ্য বলছে:
এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে, বাংলাদেশিরা অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে উচ্চশিক্ষিত অভিবাসী জনগোষ্ঠীগুলোর একটি।
বাংলাদেশিরা কোন ধরনের কাজ করছেন?
২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, কর্মক্ষম বাংলাদেশিদের ৭১ দশমিক ৯ শতাংশ শ্রমবাজারে সক্রিয় ছিলেন। তাঁদের মধ্যে:
সুপারমার্কেট, হাসপাতাল, বিশ্ববিদ্যালয়, শিশু পরিচর্যা এবং সাধারণ চিকিৎসাসেবা বাংলাদেশিদের প্রধান কর্মক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি, প্রকৌশল, হিসাবরক্ষণ, ব্যাংকিং, নির্মাণ, পরিবহন, সরকারি চাকরি, গবেষণা এবং ব্যবসায়ও বাংলাদেশিদের উপস্থিতি বাড়ছে।
আমাদের ইতিবাচক দিক
বাংলাদেশি কমিউনিটির বড় সম্পদ হচ্ছে উচ্চশিক্ষা, কঠোর পরিশ্রম, পারিবারিক বন্ধন এবং নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা।
স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, প্রযুক্তি, গবেষণা, অবকাঠামো, পরিবহন, ব্যবসা ও কমিউনিটি সেবার মাধ্যমে বাংলাদেশিরা অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। একই সঙ্গে তাঁরা বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে শিক্ষা, বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও মানুষের সম্পর্ককে শক্তিশালী করছেন।
দ্বিতীয় প্রজন্মের বাংলাদেশি-অস্ট্রেলীয় তরুণেরা শিক্ষা, খেলাধুলা, গণমাধ্যম, আইন, রাজনীতি ও সরকারি প্রশাসনে এগিয়ে আসছেন। সঠিক সহযোগিতা পেলে আগামী দশকে এই প্রজন্মই কমিউনিটিকে মূলধারায় আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।
উচ্চশিক্ষিত—তবু যোগ্যতার চাকরি নেই
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যকার বিশাল ব্যবধান। ২০২১ সালের আদমশুমারিতে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারী শ্রমশক্তির বেকারত্বের হার ছিল ৯ দশমিক ৩ শতাংশ। একই সময়ে অস্ট্রেলিয়ার সামগ্রিক বেকারত্ব ছিল ৫ দশমিক ১ শতাংশ।
অর্থাৎ ডিগ্রি থাকলেও অনেক বাংলাদেশি তাঁদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরি পাচ্ছেন না। বিদেশি ডিগ্রির স্বীকৃতি না পাওয়া, অস্ট্রেলীয় কাজের অভিজ্ঞতার অভাব, দুর্বল পেশাগত যোগাযোগ, নিয়োগে বৈষম্য এবং ভিসার সীমাবদ্ধতা অনেককে কম দক্ষতা ও কম বেতনের কাজে ঠেলে দিচ্ছে।
বাংলাদেশে চিকিৎসক, প্রকৌশলী, শিক্ষক, ব্যাংকার বা সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করা অনেক মানুষ অস্ট্রেলিয়ায় এসে বছরের পর বছর ড্রাইভিং, ডেলিভারি, নিরাপত্তা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অথবা সাধারণ বিক্রয়কর্মীর চাকরিতে আটকে থাকছেন। কোনো কাজই ছোট নয়; কিন্তু উচ্চশিক্ষিত মানুষকে তাঁর দক্ষতা ব্যবহারের সুযোগ না দেওয়া ব্যক্তি ও রাষ্ট্র—উভয়ের জন্যই অপচয়।
কমিউনিটির নেতিবাচক ও দুর্বল দিক
আমার দৃষ্টিতে, বাংলাদেশি কমিউনিটির কয়েকটি অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাও অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে:
শুধু অনুষ্ঠান, ছবি, পদবি ও সংগঠনের সংখ্যা দিয়ে একটি শক্তিশালী কমিউনিটি তৈরি হয় না। প্রয়োজন দক্ষ নেতৃত্ব, জবাবদিহি, পেশাগত নেটওয়ার্ক এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সুস্পষ্ট পরিকল্পনা।
স্বাস্থ্যঝুঁকিও উপেক্ষা করা যাবে না
অস্ট্রেলিয়ান ইনস্টিটিউট অব হেলথ অ্যান্ড ওয়েলফেয়ারের বয়স-সমন্বিত বিশ্লেষণে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণকারীদের মধ্যে ডায়াবেটিসের হার ১২ শতাংশ এবং হৃদ্রোগের হার ৪ দশমিক ৬ শতাংশ পাওয়া গেছে। দেশভিত্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই দুটি রোগের সর্বোচ্চ হার বাংলাদেশিদের মধ্যেই পাওয়া যায়।
খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব, মানসিক চাপ এবং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা না করার প্রবণতা এই ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই বাংলা ভাষায় স্বাস্থ্যসচেতনতা কার্যক্রম এবং নিয়মিত পরীক্ষার ব্যবস্থা অত্যন্ত জরুরি।
এখন কী করা প্রয়োজন?
বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য এখন প্রয়োজন:
অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশিদের সংখ্যা বাড়ছে—এটি নিঃসন্দেহে আনন্দের সংবাদ। কিন্তু শুধু সংখ্যা বৃদ্ধি সাফল্যের মাপকাঠি নয়। আমাদের দেখতে হবে, কতজন যোগ্যতার চাকরি পাচ্ছেন, কতজন সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় পৌঁছাচ্ছেন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আমরা কেমন ভিত্তি তৈরি করছি।
অস্ট্রেলিয়ার বাংলাদেশিরা উচ্চশিক্ষিত, পরিশ্রমী ও সম্ভাবনাময়—কিন্তু ঐক্য, দক্ষ নেতৃত্ব এবং যোগ্যতার যথাযথ ব্যবহারের অভাব দূর করতে না পারলে এই বিশাল সম্ভাবনার একটি বড় অংশ অপচয় হয়ে যাবে।
সূত্র: Australian Bureau of Statistics, Australian Department of Education, ABS Bangladesh-born Census Profile, Australian Institute of Health and Welfare.
কামরুল ইসলাম
প্রধান সম্পাদক
Email: editor@abnews.com.au












































আপনার মতামত লিখুন :