

অস্ট্রেলিয়ায় তিন বছরের জন্য নেট বিদেশি অভিবাসন বা Net Overseas Migration শূন্যে নামিয়ে আনার প্রস্তাব ঘিরে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে। ওয়ান নেশনের এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে দেশটির অর্থনীতি, শ্রমবাজার এবং জরুরি পরিষেবায় ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদ ও শিল্পনেতারা।
ওয়ান নেশনের পরিকল্পনার লক্ষ্য স্থায়ী অভিবাসীর পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানরত অস্থায়ী ভিসাধারীদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমানো। দলটির দাবি, অতিরিক্ত অভিবাসনের কারণে আবাসনসংকট, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সরকারি পরিষেবার ওপর চাপ বেড়েছে।
তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নেট মাইগ্রেশন শূন্য করা মানে শুধু নতুন মানুষের আগমন বন্ধ করা নয়। দেশ ছেড়ে যাওয়া মানুষের সংখ্যার সমানসংখ্যক অভিবাসী গ্রহণ করতে হবে—যার ফলে অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যা ও শ্রমশক্তির প্রবৃদ্ধি কার্যত থেমে যেতে পারে।
রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক জর্জ মেগালোজেনিস সতর্ক করেছেন, পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি ১৮৯০-এর দশক বা ১৯৩০-এর মহামন্দার সময়ের মতো গুরুতর সংকোচনের মুখে পড়তে পারে।
অস্ট্রেলিয়ার কৃষি, নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা, বৃদ্ধসেবা, আতিথেয়তা, পর্যটন, প্রযুক্তি এবং শিক্ষা খাত বিদেশি কর্মী ও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। অভিবাসন হঠাৎ শূন্যে নামিয়ে আনলে এসব খাতে দক্ষ ও সাধারণ—দুই ধরনের কর্মীরই তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে আঞ্চলিক অস্ট্রেলিয়ায় চিকিৎসক, নার্স, বৃদ্ধসেবা কর্মী, কৃষিশ্রমিক এবং নির্মাণকর্মীর ঘাটতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে হাসপাতাল ও কেয়ার সেন্টারের সেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আবাসন নির্মাণও ধীর হয়ে যেতে পারে।
ওয়ান নেশন মনে করে, অভিবাসন কমানো হলে বাড়ি ও ভাড়ার ওপর চাপ কমবে। কিন্তু নির্মাণশিল্পের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের যুক্তি, নতুন বাড়ি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় বিপুলসংখ্যক শ্রমিকই বিদেশ থেকে আসছেন।
অর্থাৎ অভিবাসন বন্ধ করে আবাসনের চাহিদা কিছুটা কমানো গেলেও প্রয়োজনীয় নির্মাণকর্মীর অভাবে নতুন বাড়ির সরবরাহ আরও কমে যেতে পারে। এতে আবাসনসংকটের মূল সমস্যার সমাধান না হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। অভিবাসন ও অস্থায়ী ভিসায় কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস, কোর্স এবং গবেষণা কার্যক্রম চালু রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে শিক্ষা খাতের প্রতিনিধিরা সতর্ক করেছেন।
ছোট ব্যবসা, রেস্তোরাঁ, হোটেল, খামার এবং আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোও কর্মী না পাওয়ায় কার্যক্রম সীমিত বা বন্ধ করতে বাধ্য হতে পারে। এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত পণ্য ও সেবার মূল্য বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়াতে পারে।
আলবানিজ সরকার এবং অন্যান্য প্রধান রাজনৈতিক দল অভিবাসনের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণের কথা বললেও নেট মাইগ্রেশন সম্পূর্ণ শূন্য করার পরিকল্পনাকে সমর্থন করছে না। তাদের মতে, আবাসন ও অবকাঠামোর সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অভিবাসন পরিচালনা প্রয়োজন; হঠাৎ করে তা বন্ধ করা বাস্তবসম্মত নয়।
ন্যাশনাল ফার্মার্স ফেডারেশন এবং অস্ট্রেলিয়ান চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিসহ বিভিন্ন সংগঠনও পরিকল্পনাটির বিরোধিতা করেছে। তাদের আশঙ্কা, এতে জরুরি পরিষেবা, আঞ্চলিক অর্থনীতি এবং জাতীয় উৎপাদনশীলতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অস্ট্রেলিয়ার আবাসনসংকটের জন্য অভিবাসীদের এককভাবে দায়ী করা যায় না। পর্যাপ্ত বাড়ি নির্মাণে ব্যর্থতা, জমি ছাড়ে বিলম্ব, পরিকল্পনা অনুমোদনের জটিলতা, অবকাঠামোর ঘাটতি এবং নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধিও বর্তমান সংকটের গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
অভিবাসনের সংখ্যা অবশ্যই দেশের আবাসন, হাসপাতাল, স্কুল ও পরিবহন সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া দরকার। তবে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তার জন্য হঠাৎ অভিবাসন শূন্যে নামিয়ে আনা হলে অস্ট্রেলিয়া যে শ্রমিকদের ওপর নির্ভরশীল, তাঁদের হারিয়ে অর্থনীতিই বড় মূল্য দিতে পারে।
অতএব মূল প্রশ্ন হলো—অস্ট্রেলিয়া কি পরিকল্পিত ও দক্ষতাভিত্তিক অভিবাসন সংস্কার করবে, নাকি অভিবাসনবিরোধী রাজনীতির চাপে দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দেবে?












































আপনার মতামত লিখুন :