

বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ১৩৯ থেকে বেড়ে ১৪৯ জনে পৌঁছেছে। একই সঙ্গে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫১ হাজার ৮৩৭ জনে।
গত ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ১৩৯ জনের মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছিল। এরপর মাত্র তিন দিনের ব্যবধানে আরও ১০ জনের মৃত্যু হওয়ায় মোট মৃত্যুসংখ্যা ১৪৯-এ পৌঁছেছে। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ছয়জনের মৃত্যু এবং নতুন করে ১,৫৬১ জনের হাসপাতালে ভর্তির তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে ডেঙ্গুতে মোট পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছিল। এরপর জুনে ১৩, জুলাইয়ে ৩৬ এবং আগস্টে ৪৩ জনের মৃত্যু হয়।
কিন্তু সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৩ দিনেই মৃত্যু হয়েছে ৫২ জনের, যা চলতি বছরের যেকোনো মাসের তুলনায় সর্বোচ্চ। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের অর্ধেক সময় পার হওয়ার আগেই পরিস্থিতি আগের মাসগুলোর তুলনায় অনেক বেশি ভয়াবহ হয়ে উঠেছে।
সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ১,৩৯৪ জন রোগী সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। চলতি বছর এ পর্যন্ত মোট ৪৮ হাজার ৯৩ জন চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান—IEDCR জানিয়েছে, ডেঙ্গু এখন বাংলাদেশের ৬৪ জেলাতেই ছড়িয়ে পড়েছে। আগামী সপ্তাহে ঢাকা ও আরও ১৪টি জেলায় পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।
উচ্চঝুঁকিতে থাকা জেলাগুলোর মধ্যে রয়েছে—
বাগেরহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নরসিংদী, যশোর, চাঁদপুর, মানিকগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও রাজশাহীর পরিস্থিতিও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের পরামর্শ দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহ সংক্রমণের হার উচ্চ থাকতে পারে। ঢাকা এখনো সবচেয়ে বেশি চাপের মধ্যে থাকলেও খুলনা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জে দ্রুত রোগী বাড়ার বিষয়টি বিশেষ উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
IEDCR-এর হাসপাতালভিত্তিক নজরদারিতে দেখা গেছে, চলতি বছর DENV-3 ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রধান ধরন হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। পরীক্ষিত নমুনার ৯১.৫ শতাংশে DENV-3 এবং ৮.৫ শতাংশে DENV-2 পাওয়া গেছে।
২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দেশে DENV-2-এর প্রাধান্য ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে এক ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তি পরে অন্য ধরনের ভাইরাসে সংক্রমিত হলে গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
তবে এই ফলাফল সীমিতসংখ্যক হাসপাতালভিত্তিক নমুনার ওপর করা বিশ্লেষণ; এটিকে দেশের সব রোগীর পূর্ণাঙ্গ চিত্র হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
স্বাস্থ্য ও কীটতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু ফগিং করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এডিস মশার ডিম ও লার্ভা ধ্বংস করতে বাড়ি, নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, বাগান, পরিত্যক্ত পাত্র এবং জমে থাকা স্বচ্ছ পানি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে।
এডিস মশা এখন আর শুধু ঢাকা বা বড় শহরে সীমাবদ্ধ নেই। জেলা, উপজেলা এবং অনেক গ্রামেও মশাটি ছড়িয়ে পড়েছে। ফলে স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং জনগণকে সমন্বিতভাবে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে।
সরকার ইতোমধ্যে তিন মাসব্যাপী দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করেছে। নাগরিকদের প্রতি সপ্তাহে অন্তত এক ঘণ্টা নিজ নিজ বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল ও আশপাশ পরিষ্কার করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে, ডেঙ্গুর গুরুতর লক্ষণ অনেক সময় জ্বর কমে যাওয়ার পর দেখা দেয়। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, দ্রুত শ্বাস নেওয়া, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত, প্রচণ্ড দুর্বলতা, অস্থিরতা, অতিরিক্ত তৃষ্ণা অথবা ফ্যাকাশে ও ঠান্ডা ত্বক গুরুতর ডেঙ্গুর লক্ষণ হতে পারে।
এ ধরনের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করা এবং পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ করা জরুরি। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যাসপিরিন বা আইবুপ্রোফেন গ্রহণ করা উচিত নয়, কারণ এগুলো রক্তপাতের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
মৃত্যু ও সংক্রমণের বর্তমান ঊর্ধ্বগতি স্পষ্ট করছে—বাংলাদেশে ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি বা শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক রোগ নয়। কার্যকর মশা নিয়ন্ত্রণ, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত না হলে সেপ্টেম্বরের শেষ ও অক্টোবরের শুরুতে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।












































আপনার মতামত লিখুন :