

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই কর্মী নিয়োগ ও আঞ্চলিক পক্ষপাতের তথ্য; ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত নিয়োগ পাওয়া ১০ হাজার ৮৩২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর মধ্যে ৮ হাজার ৫৪২ জনকে কোনো উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তি বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।
এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকার সময় এসব নিয়োগ দেওয়া হয় বলে প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টারসহ একাধিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে।
চট্টগ্রামের বাসিন্দা প্রায় ৭৫ শতাংশ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সময়ে নিয়োগ পাওয়া ১০ হাজার ৮৩২ জনের মধ্যে ৮ হাজার ৯৯ জন—প্রায় ৭৪.৭৭ শতাংশ—চট্টগ্রাম জেলার বাসিন্দা।
এর মধ্যে ৫ হাজার ১৪৮ জন এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমের নিজ উপজেলা পটিয়ার বাসিন্দা। অর্থাৎ, ওই সময় ইসলামী ব্যাংকের মোট নিয়োগের প্রায় ৪৭.৫ শতাংশই এসেছে একটি উপজেলা থেকে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রয়োজনের পরিবর্তে ব্যক্তিগত স্বার্থে এ ধরনের নিয়োগ ব্যাংকটির বেতন ব্যয় বাড়িয়েছে এবং কর্মীদের মধ্যে অস্বাভাবিক আঞ্চলিক কেন্দ্রীকরণ তৈরি করেছে।
নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বদলে ‘সিভি বাক্স’
পরিদর্শন প্রতিবেদনের তথ্যমতে, চাকরিপ্রার্থীদের জীবনবৃত্তান্ত সংগ্রহের জন্য পটিয়ায় এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের বাসভবন এবং চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জের ব্যবসায়িক কার্যালয়ে বিশেষ বাক্স রাখা হয়েছিল।
বাক্সগুলোর গায়ে ‘পটিয়া জেনারেল’, ‘পটিয়া ক্যাশ’, ‘সাতকানিয়া-লোহাগাড়া’, ‘নারী ক্যাশ’ এবং ‘পিয়ন-ডিপ্লোমা’সহ বিভিন্ন শ্রেণির নাম লেখা ছিল। পছন্দের প্রার্থীদের তালিকা তৈরির পর এসব জীবনবৃত্তান্ত ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হতো এবং সেখান থেকে নিয়োগপত্র দেওয়া হতো বলে প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।
ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগে এসব প্রার্থীর লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষার মূল্যায়নপত্র পাওয়া যায়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রবেশনারি অফিসার নিয়োগেও অনিয়মের অভিযোগ
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনিয়ম শুধু নিম্ন পর্যায়ের পদে সীমাবদ্ধ ছিল না। ২০১৯ সালে ২৪তম প্রবেশনারি অফিসার ব্যাচে সংবাদপত্রে কোনো বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ না করেই ১৭৮ জন কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল।
একইভাবে ২৩তম থেকে ২৬তম—এই চারটি প্রবেশনারি অফিসার ব্যাচে সরাসরি নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালা অনুযায়ী, নিয়োগের কমপক্ষে ১৫ দিন আগে দুটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ, লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা গ্রহণ এবং লিখিত পরীক্ষায় অন্তত ৫০ শতাংশ নম্বর পাওয়ার নিয়ম ছিল। কিন্তু একাধিক নিয়োগে এসব নিয়ম অনুসরণ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিদর্শনের সময় বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নিয়োগ পাওয়া ১০ জন কর্মকর্তার লিখিত বক্তব্য নেয়। তাঁদের সবাই কেবল মৌখিক পরীক্ষার মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়ার কথা জানিয়েছেন; দুজন কোনো মৌখিক পরীক্ষাতেও অংশ নেননি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা ও চাকরিচ্যুতি
বাংলাদেশ ব্যাংক ও বহিরাগত নিরীক্ষা প্রতিবেদনের পর ইসলামী ব্যাংক এস আলম আমলে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষার সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের সহযোগিতায় পরীক্ষাটি আয়োজন করা হয়েছিল।
ব্যাংকটির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম কামাল উদ্দিন জসিম জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরামর্শে কর্মীদের পরীক্ষায় ডাকা হলেও তাঁরা অংশ নেননি। পরে নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন থাকা পাঁচ হাজারের বেশি কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়।
তবে চাকরি হারানো কর্মকর্তাদের একটি অংশ এসব সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে পুনর্বহালের দাবি জানিয়ে আসছেন। ফলে বিষয়টি নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি শ্রম ও আইনি বিরোধেও পরিণত হয়েছে।
অনিয়ম প্রমাণিত হলে ব্যবস্থার আশ্বাস
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান দ্য ডেইলি স্টারকে বলেছেন, তিনি প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্য সম্পর্কে তখনো অবগত ছিলেন না। তবে তদন্তে কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলো ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছ নিয়োগ, যোগ্যতার মূল্যায়ন এবং পরিচালনা পর্ষদের জবাবদিহি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
প্রতিবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক ও বিচারিক প্রক্রিয়ায় চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত এগুলোকে অভিযোগ ও তদন্তের তথ্য হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে।














































আপনার মতামত লিখুন :