অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী হওয়ার কথা ছিল যে শহরের, এখন সেখানে শুধুই ভূতুড়ে নীরবতা


নিউজ ডেক্স প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ৩, ২০২৬, ৬:২৫ পূর্বাহ্ন
অস্ট্রেলিয়ার রাজধানী হওয়ার কথা ছিল যে শহরের, এখন সেখানে শুধুই ভূতুড়ে নীরবতা

অস্ট্রেলিয়ার নর্দার্ন টেরিটরির বিস্তীর্ণ জনশূন্য অঞ্চলে পড়ে রয়েছে নিউক্যাসল ওয়াটার্স—একটি প্রায় পরিত্যক্ত শহর, যেখানে ভাঙাচোরা ভবন, বন্ধ হোটেল এবং ধুলোমাখা পথ এখনো অতীতের বিস্ময়কর ইতিহাস বহন করছে।

প্রায় এক শতাব্দী আগে এই ছোট শহরটিকেই ‘নর্থ অস্ট্রেলিয়া’ অঞ্চলের প্রশাসনিক রাজধানী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল সরকার। তবে সেই পরিকল্পনা কখনো বাস্তবায়িত হয়নি।

আইনের মাধ্যমে রাজধানী নির্বাচিত

১৯২৬ সালের Northern Australia Act অনুসারে তৎকালীন নর্দার্ন টেরিটরিকে দুটি পৃথক প্রশাসনিক অঞ্চলে ভাগ করা হয়—নর্থ অস্ট্রেলিয়া ও সেন্ট্রাল অস্ট্রেলিয়া।

অ্যালিস স্প্রিংসকে সেন্ট্রাল অস্ট্রেলিয়ার প্রশাসনিক কেন্দ্র এবং নিউক্যাসল ওয়াটার্সকে নর্থ অস্ট্রেলিয়ার স্থায়ী প্রশাসনিক কেন্দ্র করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

আইনে বলা হয়েছিল, যত দ্রুত সম্ভব নিউক্যাসল ওয়াটার্সে নর্থ অস্ট্রেলিয়ার সরকার পরিচালনার কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। সেটি নির্মিত না হওয়া পর্যন্ত ডারউইন অস্থায়ী প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে থাকবে।

তবে প্রয়োজনীয় অর্থ, অবকাঠামো ও রাজনৈতিক সমর্থনের অভাবে নিউক্যাসল ওয়াটার্সে পরিকল্পিত রাজধানী কখনো গড়ে ওঠেনি। ১৯৩১ সালে আইনটি বাতিল করে দুটি অঞ্চলকে আবার একত্রিত করা হয়। ফলে ডারউইনই নর্দার্ন টেরিটরির প্রশাসনিক কেন্দ্র থেকে যায়। ঐতিহাসিক আইনের তথ্য⁠

একসময় ছিল ব্যস্ত বাণিজ্যকেন্দ্র

ডারউইনের কয়েকশ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত নিউক্যাসল ওয়াটার্স একসময় উত্তর অস্ট্রেলিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অভ্যন্তরীণ জনপদ ছিল।

শহরটির পাশ দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ঐতিহাসিক ওভারল্যান্ড টেলিগ্রাফ লাইন চলে গিয়েছিল। একই সঙ্গে কয়েকটি বড় গবাদিপশু চলাচলের পথ এখানে এসে মিলিত হতো। কিম্বার্লিসহ প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে হাজার হাজার গরু নিয়ে পশুপালকেরা বিপজ্জনক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে এই শহরে আসতেন।

তাঁদের বিশ্রাম, খাবার ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল নিউক্যাসল ওয়াটার্স। এখানে গড়ে উঠেছিল জাংশন হোটেল, জেনারেল স্টোর, পুলিশ স্টেশন, গির্জা, ডাকঘর এবং ছোট বিমানবন্দর। একসময় সেই বিমানবন্দরে কোয়ান্টাসের উড়োজাহাজও যাত্রাবিরতি করত।

ঐতিহাসিক জোন্স স্টোর ছিল দোকানের পাশাপাশি কসাইখানা, বেকারি ও পোলট্রি ব্যবসার কেন্দ্র। বর্তমানে এটি সংরক্ষণের চেষ্টা চালাচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবীরা।

সড়ক পরিবহনই বদলে দেয় শহরের ভাগ্য

১৯৬০-এর দশকে অস্ট্রেলিয়ার উত্তরাঞ্চলে উন্নত সড়ক নির্মাণ এবং গবাদিপশু পরিবহনে বড় রোড ট্রেনের ব্যবহার শুরু হয়। ফলে দীর্ঘ পথ হেঁটে গরু নিয়ে যাওয়ার পুরোনো ব্যবস্থা দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যায়।

ডারউইন ও ক্যাথরিনে কসাইখানা চালু হওয়ার পর নিউক্যাসল ওয়াটার্সের অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও কমে যায়। দোকান, হোটেল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান একে একে বন্ধ হয়ে যায় এবং বাসিন্দারা শহর ছেড়ে চলে যান।

বর্তমানে ঐতিহাসিক শহরটিতে কোনো স্থায়ী বাসিন্দা নেই। তবে কাছাকাছি একটি স্কুল স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়ের শিশুদের শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছে এবং নিউক্যাসল ওয়াটার্সের বিশাল গবাদিপশুর খামার এখনো সক্রিয় রয়েছে।

ইতিহাস রক্ষার চেষ্টা

১৯৯৩ সালে নিউক্যাসল ওয়াটার্সকে ঐতিহাসিক ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়। স্থানীয় ইতিহাসপ্রেমী ও Mates of the Murranji নামে একটি সংগঠন শহরের অবশিষ্ট ভবনগুলো সংরক্ষণ এবং এর হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।

আজ নিউক্যাসল ওয়াটার্স অস্ট্রেলিয়ার একটি নীরব ‘ঘোস্ট টাউন’। অথচ প্রায় একশ বছর আগে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে এখানেই হয়তো দাঁড়িয়ে থাকত সরকারি ভবন, সংসদীয় দপ্তর এবং হাজারো মানুষের ব্যস্ত একটি রাজধানী শহর।

বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিউক্যাসল ওয়াটার্সকে অস্ট্রেলিয়ার জাতীয় রাজধানী করার পরিকল্পনা ছিল না; এটি বিলুপ্ত নর্থ অস্ট্রেলিয়া প্রশাসনিক অঞ্চলের রাজধানী হওয়ার জন্য নির্বাচিত হয়েছিল।

ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন: