
বাসা ভাড়া নেওয়া এবং পরবর্তীতে নিজের বাড়ি কেনার যে প্রথাগত ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়াটি প্রচলিত ছিল, তাতে এখন পরিবর্তন আসছে। ২০৩০ সালের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার জনসংখ্যা ৩ কোটিতে (৩০ মিলিয়ন) পৌঁছাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, অথচ সেই তুলনায় আবাসন সরবরাহের হার চাহিদার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না। আগামী পাঁচ বছরে ১২ লাখ (১.২ মিলিয়ন) নতুন বাড়ি তৈরির যে জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তাতেও ২৯ সালের জুন নাগাদ ২ লাখ ৬২ হাজার বাড়ির ঘাটতি দেখা দিতে পারে বলে পূর্বাভাস পাওয়া গেছে।
চাহিদা ও সরবরাহের এই ভারসাম্যহীনতা এবং সেই সাথে ঋণের উচ্চ সুদের হারের কারণে প্রথাগত উপায়ে বাড়ির মালিক হওয়াটা ক্রমশ সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বর্তমানে ৬৫ শতাংশ অস্ট্রেলীয় মনে করেন যে, পরবর্তী প্রজন্মের জন্য বাড়ি কেনার সেই প্রথাগত পথটি আর কার্যকর নেই।
পরিস্থিতিটি বোঝার জন্য একটি উদাহরণ দেওয়া যাক—সিডনিতে এখন বাড়ির মধ্যক মূল্য (median price) গড় বার্ষিক আয়ের ১৬.৭ গুণ; অথচ ১৯৮১ সালে এই অনুপাতটি ছিল মাত্র ৫ গুণ। মেলবোর্ন (১০.১ গুণ), ব্রিসবেন (১১.৩ গুণ) এবং পার্থের (১১ গুণ) ক্ষেত্রেও একই ধরনের চাপ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এর ফলে অস্ট্রেলীয়রা তাদের জীবনযাপনের ধরন নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা করতে শুরু করেছেন, যার ফলে সাংস্কৃতিক ও জনমিতিক ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে—আর তা হলো একাধিক প্রজন্মের একত্রে বসবাসের (multi-generational household) প্রবণতা বৃদ্ধি।
স্বাধীন জীবনযাত্রায় বিলম্ব
আবাসন বাজার সাধারণের নাগালের বাইরে চলে যাওয়ায় তরুণ অস্ট্রেলীয়রা তাদের স্বাধীন জীবন শুরুর সময়সূচি পুনর্বিন্যাস করছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, তরুণরা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে বাবা-মায়ের সাথে বসবাস করছে। ২০০৬ সালে ১৯ বছর বয়সী তরুণদের মধ্যে ৬০ শতাংশই বাবা-মায়ের সাথে থাকত; ২০২১ সালে এই হার বেড়ে ৭০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
শিক্ষাজীবনের ঋণের বোঝা এবং অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক আবাসন বাজারের চ্যালেঞ্জের মুখে অনেক তরুণই প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের প্রথাগত ধাপগুলো (যেমন—নিজস্ব বাড়ি বা আলাদা সংসার) পার করার বিষয়টি পিছিয়ে দিচ্ছে। আবার অনেকে, যারা আগে আলাদা থাকতে শুরু করেছিল, তারাও এখন উপার্জনের সেরা সময়টিতে এবং পরিবার গঠনের পর্যায়ে পুনরায় পারিবারিক আবাসে ফিরে আসছে; এর উদ্দেশ্য হলো সম্পদ একত্রিত করা এবং বাড়ির জন্য প্রয়োজনীয় জমার (ডিপোজিট) অর্থ দ্রুত সংগ্রহ করা।


সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও উন্মুক্ত মানসিকতা
একাধিক প্রজন্মের একত্রে বসবাস—অর্থাৎ একই ছাদের নিচে বা একই প্রাঙ্গণে তিন বা ততোধিক প্রজন্মের মানুষের বসবাস—এখন আর কোনো শেষ অবলম্বন বা বাধ্যবাধকতা নয়, বরং একটি গ্রহণযোগ্য বিকল্প হিসেবে মূলধারায় উঠে আসছে। প্রতি পাঁচজন অস্ট্রেলীয়র মধ্যে প্রায় তিনজনই (৫৭ শতাংশ) জানিয়েছেন যে, তারা পরিবারের সাথে একাধিক প্রজন্মের যৌথ আবাসে বসবাসের বিষয়টি ইতিবাচকভাবে দেখছেন বা এমন ব্যবস্থায় থাকতে আগ্রহী।
জীবনযাপনের এই পদ্ধতিটি ইতিমধ্যেই অস্ট্রেলিয়ার সামাজিক কাঠামোর সাথে গভীরভাবে মিশে গেছে। জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক মানুষেরই এ বিষয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা রয়েছে: বর্তমানে ১২ শতাংশ মানুষ একাধিক প্রজন্মের সদস্যদের সাথে একই বাড়িতে বসবাস করছেন এবং ৩২ শতাংশ মানুষ অতীতে এমন পরিবেশে বসবাস করেছেন।
এই ধরনের জীবনযাত্রার প্রতি আগ্রহ বা উন্মুক্ত মনোভাবের ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক পটভূমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেসব অস্ট্রেলীয় বাড়িতে ইংরেজি ছাড়া অন্য কোনো ভাষায় কথা বলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে একাধিক প্রজন্মের সাথে একই বাড়িতে বসবাসের অভিজ্ঞতা থাকার হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি (ইংরেজি-ভাষী জনগোষ্ঠীর ৩৯ শতাংশের তুলনায় ৭১ শতাংশ)। অস্ট্রেলিয়ায় সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য বৃদ্ধির সাথে সাথে যৌথ পারিবারিক জীবনযাপনের প্রতি আগ্রহও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
ব্যক্তিগত পরিসর বনাম সীমানা
অস্ট্রেলীয়রা যৌথভাবে বসবাসের ধারণার প্রতি ক্রমশ আগ্রহী হয়ে উঠলেও, তারা তাদের ব্যক্তিগত পরিসর বা গোপনীয়তা রক্ষায় অত্যন্ত সচেতন। যখন কোনো একটিকে বেছে নেওয়ার প্রশ্ন আসে, তখন ৭৩ শতাংশ অস্ট্রেলীয়ই বড় ও উন্নত মানের বাড়িতে একাধিক প্রজন্মের সাথে বসবাসের চেয়ে ছোট অ্যাপার্টমেন্টে সম্পূর্ণ গোপনীয়তা বজায় রেখে বসবাস করাকে অগ্রাধিকার দেন।
স্বাধীনতার এই আকাঙ্ক্ষা জীবনের সব পর্যায়েই দেখা যায়; বিশেষ করে ‘জেনারেশন জেড’ (৮১%) এবং ‘বেবি বুমার’ (৭৯%) প্রজন্মের মানুষেরা স্বাধীনতার বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেন। ফলস্বরূপ, অস্ট্রেলীয়রা এক ছাদের নিচে বসবাসের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত বিষয়গুলোকে প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেন:-
বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও, একাধিক প্রজন্মের একত্রে বসবাসের ব্যবহারিক ও সামাজিক সুবিধাগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ৭৭ শতাংশ মানুষ জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে গভীর উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।
একাধিক প্রজন্মের একত্রে বসবাসের প্রধান সুবিধাসমূহ:
তাৎক্ষণিক আর্থিক স্বস্তি এবং তরুণ প্রজন্মের বাড়ি কেনার জন্য সঞ্চয় করার সুযোগের পাশাপাশি, এই প্রবণতাটি অস্ট্রেলিয়ার দ্রুত বয়স্ক হতে থাকা জনসংখ্যার বিষয়ের সাথেও সম্পর্কিত। আগামী দশকগুলোতে ৬৫ বছর বা তার বেশি বয়সী অস্ট্রেলীয়দের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকায়, একাধিক প্রজন্মের একত্রে বসবাস প্রবীণদের বিশেষ পরিচর্যা কেন্দ্রের (aged care) একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প হয়ে উঠছে। বিষয়টি বিশেষ করে ‘জেনারেশন এক্স’-এর জন্য প্রাসঙ্গিক, কারণ তাদের প্রায়শই একই সাথে নিজেদের সন্তান এবং বয়স্ক ‘বেবি বুমার’ বাবা-মায়ের দেখাশোনার দায়িত্ব পালন করতে হয়।
তাছাড়া, সমাজ যখন একাকীত্বের ব্যাপক সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তখন জনসংখ্যার অর্ধেক অংশই যৌথভাবে বসবাসকে পারিবারিক বন্ধন সুদৃঢ় করার এবং দৈনন্দিন জীবনে অর্থবহ সম্পর্ক গড়ে তোলার একটি সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করে।
# Mccrindle গবেষণা থেকে












































আপনার মতামত লিখুন :