দলীয় দুর্নীতিবাজ ও ক্ষমতালোভীদের দমন করতে না পারলে তারেক রহমানের সরকারও ব্যর্থ হবে


নিউজ ডেক্স প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ৪, ২০২৬, ৮:১৮ অপরাহ্ন
দলীয় দুর্নীতিবাজ ও ক্ষমতালোভীদের দমন করতে না পারলে তারেক রহমানের সরকারও ব্যর্থ হবে

বাংলাদেশের মানুষ শুধু একটি সরকারের পরিবর্তন চায়নি; তারা চেয়েছে রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রশাসন এবং ক্ষমতা ব্যবহারের পদ্ধতির পরিবর্তন। ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তাঁর দল সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে—যা বড় সংস্কার বাস্তবায়নের বিরাট সুযোগ, আবার নিয়ন্ত্রণহীন ক্ষমতার ঝুঁকিও সৃষ্টি করতে পারে। 

প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে সৎ, সংযত কিংবা জনবান্ধব ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা করলেও তাঁর মন্ত্রী, সংসদ সদস্য এবং দলীয় নেতারা একই নীতি অনুসরণ না করলে সেই ভাবমূর্তি টিকবে না। একজন প্রধানমন্ত্রী একা দেশ পরিচালনা করেন না—তাঁর সাফল্য নির্ভর করে তাঁর চারপাশের মানুষদের সততা, যোগ্যতা ও জবাবদিহির ওপর।

কেন সরকার সফল হতে পারছে না?

প্রথমত, প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। প্রটোকল ও রাষ্ট্রীয় ব্যয় কমানো, সংসদ সদস্যদের শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লটের সুবিধা বাতিলসহ কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বলেছে, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে জবাবদিহি ও দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমের সুস্পষ্ট রোডম্যাপ দেখা যায়নি; গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় স্থায়ী কমিটির অনুপস্থিতিও সংসদের নজরদারি দুর্বল করেছে।

দ্বিতীয়ত, কিছু জনপ্রতিনিধি নিজেদের আইনপ্রণেতা না ভেবে এলাকার সর্বময় নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। নিয়োগ, বদলি, টেন্ডার, ঠিকাদারি, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের পুরোনো সংস্কৃতি চলতে থাকলে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি অর্থহীন হয়ে যাবে।

তৃতীয়ত, যোগ্যতার পরিবর্তে দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া হলে প্রশাসন দুর্বল ও দলীয়করণ আরও শক্তিশালী হবে। সরকারের ছয় মাসের মূল্যায়নে বিশ্লেষকেরা প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ্য এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয়হীনতা, দলীয় নিয়োগ এবং সংস্কার বাস্তবায়নে ধীরগতির কথা বলেছেন।

চতুর্থত, সংসদ সদস্যদের জন্য এখনো একটি বাধ্যতামূলক ও কার্যকর আচরণবিধি নেই। অথচ স্বার্থের সংঘাত, সম্পদের হিসাব, ক্ষমতার অপব্যবহার, ঋণখেলাপি অবস্থান এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে হস্তক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ না করলে জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

পঞ্চমত, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, রাজনৈতিক প্রতিশোধ এবং “এখন আমাদের পালা” মানসিকতা কঠোরভাবে বন্ধ করা না গেলে সরকারের সব ভালো কাজ ম্লান হয়ে যাবে। দলীয় পরিচয় অপরাধের লাইসেন্স হতে পারে না।

ষষ্ঠত, জনগণ প্রতীকী পরিবর্তনের পাশাপাশি দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, ব্যাংকিং খাতের সংস্কার এবং নিরাপদ জীবন চায়। আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনীতিতে দৃশ্যমান উন্নতি না এলে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাও জনগণের আস্থা ধরে রাখতে পারবে না।

কীভাবে তারেক রহমান ও তাঁর সংসদ সদস্যরা সফল হতে পারেন?

১. নিজের দলের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করতে হবে

প্রধানমন্ত্রীকে স্পষ্টভাবে প্রমাণ করতে হবে—দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলবাজি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার করলে দলীয় পরিচয় কাউকে রক্ষা করবে না। বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সহজ; নিজের লোকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াই প্রকৃত নেতৃত্বের পরীক্ষা।

২. সংসদ সদস্যদের বাধ্যতামূলক আচরণবিধি প্রণয়ন করতে হবে

প্রত্যেক সংসদ সদস্যকে নিজের এবং পরিবারের সম্পদ, আয়, ব্যবসায়িক স্বার্থ ও সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত প্রতিবছর প্রকাশ করতে হবে। গুরুতর নৈতিক লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে স্বাধীন তদন্ত এবং সংসদীয় শাস্তির ব্যবস্থা থাকতে হবে।

৩. সংসদ সদস্যদের কাজের সীমা নির্ধারণ করতে হবে

সংসদ সদস্যরা আইন প্রণয়ন, সরকারের জবাবদিহি এবং জনগণের প্রতিনিধিত্ব করবেন। তাঁরা টেন্ডার, ঠিকাদারি, পুলিশি তদন্ত, শিক্ষক নিয়োগ কিংবা প্রশাসনিক বদলির নিয়ন্ত্রক হতে পারেন না। স্থানীয় উন্নয়ন পরিচালনার দায়িত্ব শক্তিশালী ও নির্বাচিত স্থানীয় সরকারের হাতে দিতে হবে।

৪. সংসদকে কার্যকর করতে হবে

সব স্থায়ী কমিটি দ্রুত গঠন, বিরোধী দলের সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ কমিটির নেতৃত্ব প্রদান এবং মন্ত্রীদের নিয়মিত জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সংসদ সদস্যদের উপস্থিতি, ভোট, প্রশ্ন এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অগ্রগতি জনগণের জন্য প্রকাশ করা প্রয়োজন।

৫. দলীয় আনুগত্য নয়, যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিতে হবে

বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যাংক, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রীয় সংস্থায় স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দক্ষ ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দিতে হবে। অযোগ্য দলীয় ব্যক্তিদের রাষ্ট্রীয় পদে বসালে শেষ পর্যন্ত ক্ষতি প্রধানমন্ত্রীরই হবে।

৬. স্বাধীন প্রতিষ্ঠানকে সত্যিকার অর্থে স্বাধীন করতে হবে

দুর্নীতি দমন কমিশন, নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, মানবাধিকার কমিশন এবং তথ্য কমিশনকে সরকারের প্রভাবমুক্ত করতে হবে। প্রতিষ্ঠান দুর্বল রেখে কোনো ব্যক্তির সদিচ্ছা দীর্ঘস্থায়ী সুশাসন নিশ্চিত করতে পারে না।

৭. অর্থনীতিতে দ্রুত দৃশ্যমান ফল আনতে হবে

দ্রব্যমূল্য, ব্যাংকিং খাত, খেলাপি ঋণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, বিনিয়োগ ও যুব কর্মসংস্থানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। পোশাকশিল্পের পাশাপাশি কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষ জনশক্তি এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।

৮. সমালোচনাকে শত্রুতা হিসেবে দেখা যাবে না

স্বাধীন সংবাদমাধ্যম, নাগরিক সমাজ এবং বিরোধী দলের যৌক্তিক সমালোচনা সরকারকে ভুল সংশোধনের সুযোগ দেয়। সাংবাদিক বা সমালোচকের কণ্ঠ বন্ধ করলে সরকার সাময়িক স্বস্তি পেলেও দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

৯. মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের কর্মদক্ষতা নিয়মিত মূল্যায়ন করতে হবে

প্রতিটি মন্ত্রণালয় ও সংসদীয় এলাকার জন্য পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করে ছয় মাস অন্তর অগ্রগতি প্রকাশ করা উচিত। ব্যর্থ, দুর্নীতিগ্রস্ত কিংবা অযোগ্য ব্যক্তিদের পদে রেখে শুধু রাজনৈতিক ভারসাম্য রক্ষা করলে সরকার সফল হবে না।

তারেক রহমানের সামনে এখন ইতিহাসের পরীক্ষা। তিনি কি পুরোনো দলীয় সংস্কৃতির কাছে আত্মসমর্পণ করবেন, নাকি নিজের দলের ভেতর থেকেই শুদ্ধি অভিযান শুরু করবেন?

বড় নির্বাচনী জয় একটি সরকারকে ক্ষমতা দেয়, কিন্তু জনগণের আস্থা দেয় না। সেই আস্থা অর্জন করতে হয় সততা, যোগ্যতা, ন্যায়বিচার এবং দৃশ্যমান কাজের মাধ্যমে।

প্রধানমন্ত্রী সফল হতে চাইলে তাঁকে শুধু ভালো নেতা হলেই চলবে না—তাঁকে অসৎ, অযোগ্য ও ক্ষমতালোভী সহযোগীদের বিরুদ্ধেও কঠোর হতে হবে। কারণ সংসদ সদস্যদের ব্যর্থতা শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর ব্যর্থতা হিসেবেই ইতিহাসে লেখা হবে।

কামরুল ইসলাম
প্রধান সম্পাদক

ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন: