

মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্ক নতুন কূটনৈতিক মোড়ে পৌঁছেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত বিমান হামলা আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। এর পরিবর্তে সোমবার (৩ আগস্ট) থেকে দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে নতুন দফার আলোচনা শুরু হবে।
এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় মিত্রদেশগুলোর অনুরোধ এবং ইরানের আলোচনায় আগ্রহের কারণে তিনি সামরিক পদক্ষেপ থেকে আপাতত সরে এসেছেন। তার ভাষ্য, কূটনীতিকে আরেকটি সুযোগ দিতেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, ইরানের বিরুদ্ধে একটি বড় ধরনের সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি সম্পন্ন ছিল। তবে আলোচনার সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় সেই পরিকল্পনা স্থগিত রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে বলেন, আলোচনা ব্যর্থ হলে সামরিক বিকল্প এখনও যুক্তরাষ্ট্রের সামনে খোলা রয়েছে।
রোববার সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে বড় সামরিক হামলা চালানোর মতো পরিকল্পনা প্রস্তুত করেছিল।
তার দাবি, ইরান বুঝতে পেরেছিল যে হামলার প্রস্তুতি দ্রুত এগোচ্ছে। তাই তারাও সংঘাত এড়াতে চেয়েছে। ট্রাম্প বলেন, এখন লক্ষ্য হলো একটি সমঝোতায় পৌঁছানো এবং সেই উদ্দেশ্যেই সোমবার থেকে আলোচনা শুরু হচ্ছে।
তবে এই বৈঠক কোথায় অনুষ্ঠিত হবে কিংবা কারা এতে অংশ নেবেন, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কিছু জানাননি। এর আগে শনিবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, আলোচনার জন্য একটি প্রাথমিক কাঠামো তৈরি হয়েছে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে তিনি হামলার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছেন।
ট্রাম্প জানান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার এবং ইরান-সব পক্ষ থেকেই তাকে সামরিক অভিযান স্থগিত রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
বিশেষভাবে সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ব্যক্তিগতভাবে তাকে সতর্ক করেন যে, যুদ্ধ শুরু হলে পুরো অঞ্চল ভয়াবহ মানবিক ও নিরাপত্তা সংকটে পড়তে পারে।
ট্রাম্প বলেন, মিত্রদেশগুলো বিশ্বাস করে এখনও রাজনৈতিক সমাধানের সুযোগ রয়েছে। তাদের সেই অবস্থান বিবেচনায় নিয়েই হামলার সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বড় ধরনের যুদ্ধ শুরু হলে সীমান্ত পেরিয়ে লাখো মানুষ প্রতিবেশী দেশগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হতে পারে, যা নতুন মানবিক সংকট তৈরি করবে।
মার্কিন প্রশাসন এখন আলোচনার মাধ্যমে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে চায়। এর একটি হলো হরমুজ প্রণালীতে নির্বিঘ্ন নৌ চলাচল নিশ্চিত করা, অন্যটি ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে সম্পূর্ণভাবে নিষ্ক্রিয় করা।
ট্রাম্পের ঘোষণার আগে মধ্যপ্রাচ্যে পর্দার আড়ালের কূটনৈতিক তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি দ্বিতীয় দফায় সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহানের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলেন। ওই আলোচনায় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল অসীম মুনিরও যুক্ত ছিলেন।
টেলিগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় আরাঘচি জানান, আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক সমাধানের বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে তিন পক্ষের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সবাই সামরিক উত্তেজনার পরিবর্তে সংলাপ ও সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
এদিকে ওমানের মধ্যস্থতায় তেহরান ও মুসকাটের মধ্যে হরমুজ প্রণালী-সংক্রান্ত আলোচনা শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আইআরএনএ।
তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ওমানের সঙ্গে আলোচনার মূল বিষয় হচ্ছে হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাতায়াতের একটি বিকল্প রুট নিয়ে। প্রণালী পুরোপুরি খোলা বা বন্ধ রাখার প্রশ্নটি এই আলোচনার অংশ নয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়ে। এরপর কয়েক দফা যুদ্ধবিরতির চেষ্টা হলেও সেগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
আগের একটি যুদ্ধবিরতির গুরুত্বপূর্ণ শর্ত ছিল হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত রাখা। কিন্তু সেই সমঝোতা ভেঙে যাওয়ার পর ইরান আবারও প্রণালীটির ওপর নিয়ন্ত্রণ জোরদার করে। একই সময়ে মার্কিন-ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তু এবং আন্তর্জাতিক তেলবাহী জাহাজে পাল্টাপাল্টি হামলার ঘটনাও বাড়তে থাকে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বিশ্ব অর্থনীতি নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পদক্ষেপ স্থগিতের খবরে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে তাৎক্ষণিক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারসের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪ দশমিক ০৮ ডলার বা ৪ দশমিক ৬৪ শতাংশ কমে ৮৩ দশমিক ৮৫ ডলারে নেমেছে।
অন্যদিকে ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের দাম ব্যারেলপ্রতি ৪ দশমিক ০১ ডলার বা ৪ দশমিক ৭৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৮০ দশমিক ৬৬ ডলারে।
এর আগে সংঘাত তীব্র হওয়া এবং ওমান উপকূলের কাছে বাণিজ্যিক জাহাজে ধারাবাহিক হামলার ঘটনায় গত মাসে উভয় ধরনের অপরিশোধিত তেলের দাম ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছিল।
আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষকদের মতে, সামরিক সংঘাতের পরিবর্তে আলোচনার পথে অগ্রসর হওয়ার সিদ্ধান্তই তেলের বাজারে এই স্বস্তির প্রধান কারণ।
সোমবার শুরু হতে যাওয়া নতুন দফার আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পরমাণু কর্মসূচি বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়। অন্যদিকে ইরান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং নিজেদের সার্বভৌমত্বের নিশ্চয়তা দাবি করছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যস্থতায় আপাতত সামরিক সংঘাত এড়ানো গেলেও, দুই পক্ষের আলোচনায় কতটা অগ্রগতি হবে, তার ওপরই নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির পরবর্তী গতিপথ।
এম জি














































আপনার মতামত লিখুন :