এমন একটি ঘটনা শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতিও কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়


নিউজ ডেক্স প্রকাশের সময় : অগাস্ট ৪, ২০২৬, ৯:১৭ পূর্বাহ্ন
এমন একটি ঘটনা শুধু একটি পরিবারের শোক নয়, আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রতিও কঠিন প্রশ্ন ছুড়ে দেয়

‘আমার বাবারে একটু আমার কোলে দাও…’

এই একটি বাক্যই যেন হাজার শব্দের চেয়েও ভারী।খুলনার এক মায়ের বুকফাটা এই আর্তনাদ এখন পুরো দেশের কান্না। মাত্র ৩০ বছর বয়সী অক্ষর শৌভিক রায়। মেধাবী, দায়িত্বশীল, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তান। খুলনা জিলা স্কুল, নটর ডেম কলেজ, এরপর ভারতের গুজরাটে প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফিরে পরিবারের হাল ধরেছিলেন। বাবাকে করোনার সময় হারানোর পর মা, ছোট বোন, দাদু ও দিদিমার ভরসা হয়ে উঠেছিলেন তিনি।

কিন্তু কয়েক মিনিটের একটি বিনোদন সবকিছু শেষ করে দিল।

বন্ধু ও সহকর্মীদের সঙ্গে কক্সবাজার ঘুরতে গিয়ে দরিয়ানগর সৈকতে প্যারাসেইলিংয়ে ওঠেন অক্ষর। পরিবারের সদস্যরা, বিশেষ করে তাঁর বড় বোন, তাঁকে বারবার নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু কে জানত, আকাশে ওড়ার সেই মুহূর্তই হবে জীবনের শেষ যাত্রা!

প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণ করা ভিডিওতে দেখা যায়, প্যারাসেইলিং চলাকালে তিনি অনেক উঁচু থেকে সাগরে পড়ে যান। পরে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলেও চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনার পর জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তদন্ত শুরু করেছে। প্রাথমিকভাবে অভিযোগ উঠেছে, বৈরী আবহাওয়ার মধ্যেও প্যারাসেইলিং চালানো হচ্ছিল। পরিবারের পক্ষ থেকে পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, নিরাপত্তা সরঞ্জাম, তদারকি, উদ্ধারব্যবস্থা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া আদৌ যথাযথ ছিল কি না। তদন্তের মাধ্যমে এসব বিষয়ে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

কিন্তু তদন্তের আগেই একটি সত্য স্পষ্ট হয়ে গেছে।

একজন মা তাঁর একমাত্র ভরসা হারিয়েছেন।
একটি বোন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে হারিয়েছে।
একটি পরিবার তাদের ভবিষ্যৎ হারিয়েছে।

সবচেয়ে কষ্টের দৃশ্য ছিল খুলনায় অক্ষরের মরদেহ পৌঁছানোর পর। ফ্রিজার গাড়ির দরজা খুলতেই মা শুক্লা রায়ের বুকফাটা আহাজারি, “আমার অক্ষররে একটু আমার কোলে দাও… আমার বাবারে একটু আমার কোলে দাও…”

এই কান্নার কোনো ভাষান্তর নেই।

আমরা যখন কোনো পর্যটনকেন্দ্রে যাই, তখন ধরে নিই সেখানে নিরাপত্তার ন্যূনতম মান নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু যদি সেই বিশ্বাসই ভেঙে যায়, তাহলে এটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, জননিরাপত্তারও প্রশ্ন।

অক্ষর আর ফিরবেন না। কিন্তু তাঁর মৃত্যু যদি নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরিবর্তনের কারণ হয়, যদি ভবিষ্যতে আর কোনো মাকে এমন করে সন্তানের জন্য আহাজারি করতে না হয়, তবেই হয়তো তাঁর চলে যাওয়ার বেদনার মধ্যে কিছুটা অর্থ খুঁজে পাওয়া যাবে।

অক্ষর শৌভিক রায়ের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করছি। তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা।

নিরাপদ পর্যটন কোনো বিলাসিতা নয়। এটি প্রতিটি নাগরিকের মৌলিক অধিকার।

এম মির্জা হোসাইন
ঢাকা, বাংলাদেশ

ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন: