ভারত উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশরা কি আদৌ বিতাড়িত হয়েছে?


নিউজ ডেক্স প্রকাশের সময় : মে ২৩, ২০২৬, ৭:৪২ পূর্বাহ্ন
ভারত উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশরা কি আদৌ বিতাড়িত হয়েছে?

আরিফুল ইসলাম আদীল: প্রশ্নটা শুনতে অদ্ভুত লাগতে পারে। কারণ ইতিহাস বই আমাদের বলে, ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত ছাড়ে। তাদের পতাকা নেমে যায়, নতুন রাষ্ট্র জন্ম নেয়, নতুন সরকার আসে। কিন্তু একটু গভীরে তাকালে দেখা যায়, ব্রিটিশরা শুধু শারীরিকভাবে চলে গেলেও, তাদের তৈরি করে যাওয়া অনেক কাঠামো, চিন্তা, আইন, শিক্ষা, প্রশাসন, এমনকি মানসিকতার বড় অংশ আজও ভারত উপমহাদেশের ভেতরে বেঁচে আছে।

ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের বর্তমান সংকটের শিকড় খুঁজতে গেলে বারবার ব্রিটিশ আমলের কিছু সিদ্ধান্ত সামনে চলে আসে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, যেসব নীতি তারা নিজেদের শাসন সহজ করার জন্য তৈরি করেছিল, সেগুলোই আজও কোটি মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে।

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর ধীরে ধীরে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি উপমহাদেশের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করে। পরে ১৮৫৮ সালে সরাসরি ব্রিটিশ রাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রায় ১৯০ বছর ধরে চলা এই শাসন শুধু রাজনৈতিক দখল ছিল না, এটি ছিল অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানসিক পুনর্গঠন। ইতিহাসবিদদের মতে, ১৭০০ সালে বিশ্ব অর্থনীতিতে ভারতের অংশ ছিল প্রায় ২৪%। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের শেষ দিকে তা নেমে আসে প্রায় ৪%-এ। অর্থনীতিবিদ Angus Maddison ও আরও অনেক গবেষক এই পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন।

ব্রিটিশরা উপমহাদেশে রেললাইন বানিয়েছে, আদালত বানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় বানিয়েছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো, এগুলো কার স্বার্থে তৈরি হয়েছিল?

অনেকে বলেন, “ব্রিটিশরা অন্তত রেল দিয়েছে।” কিন্তু ইতিহাস বলছে, রেলের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ভারতের মানুষের ভ্রমণ সহজ করা নয়। মূল লক্ষ্য ছিল কাঁচামাল দ্রুত বন্দর পর্যন্ত নেওয়া, সৈন্য পরিবহন সহজ করা এবং বিদ্রোহ দ্রুত দমন করা। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ ব্রিটিশদের বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, দ্রুত সেনা পরিবহন ছাড়া এত বড় অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তাই রেল ছিল একদিকে অর্থনৈতিক শোষণের পথ, অন্যদিকে সামরিক নিয়ন্ত্রণের অস্ত্র।

আজও ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের বড় শহরগুলোর অর্থনৈতিক কেন্দ্র অনেকাংশে সেই ব্রিটিশ বাণিজ্যিক রুটকে কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছে। কলকাতা, মুম্বাই, করাচি, চেন্নাই কিংবা ঢাকার মতো শহরগুলোকে এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যেন সেগুলো সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক যন্ত্র হিসেবে কাজ করে।

সবচেয়ে গভীর প্রভাবগুলোর একটি ছিল “Divide and Rule” বা বিভাজনের রাজনীতি। ব্রিটিশরা খুব ভালোভাবেই বুঝেছিল, উপমহাদেশের মানুষ এক হয়ে গেলে তাদের শাসন টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। তাই ধর্ম, ভাষা, জাতি, caste, অঞ্চল সবকিছুকে ব্যবহার করা হয়েছিল বিভক্তির হাতিয়ার হিসেবে।

১৯০৯ সালের Morley-Minto Reforms মুসলমানদের জন্য আলাদা নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু করে। পরে আরও নানা রাজনৈতিক কাঠামো ধর্মভিত্তিক বিভাজন বাড়ায়। এর ফল কী হয়েছিল, তা ১৯৪৭ সালে পুরো পৃথিবী দেখেছে। ভারত বিভক্ত হয়, পাকিস্তান সৃষ্টি হয়, এবং ইতিহাসের অন্যতম বড় মানবিক বিপর্যয় ঘটে।

বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, দেশভাগের সময় প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল। প্রায় ২ লাখ থেকে ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। “নারী নির্যাতন” , “গণহত্যা “, “দাঙ্গা” পুরো অঞ্চলকে *রক্তাক্ত করে তোলে। আজও ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক, সীমান্ত উত্তেজনা, ধর্মীয় রাজনীতি, সাম্প্রদায়িক সংঘাতের ভেতরে সেই বিভাজনের ছাপ স্পষ্ট।

মজার বিষয় হলো, ব্রিটিশরা চলে গেলেও “আমরা বনাম তারা” রাজনীতি রয়ে গেছে। এখনো দক্ষিণ এশিয়ার বহু রাজনৈতিক দল ধর্ম ও পরিচয়কে ব্যবহার করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায়। যেন ঔপনিবেশিক কৌশল শুধু শাসক বদলেছে, কিন্তু পদ্ধতি বদলায়নি।

আরেকটি বড় প্রভাব ছিল শিক্ষা ব্যবস্থা। ১৮৩৫ সালে Thomas Babington Macaulay তার বিখ্যাত “Minute on Indian Education”-এ লিখেছিলেন, এমন এক শ্রেণি তৈরি করতে হবে যারা “রক্তে ভারতীয় কিন্তু চিন্তায় ইংরেজ” হবে। এর পর থেকেই ইংরেজি শিক্ষাকে উচ্চ মর্যাদা দেওয়া শুরু হয়।

আজও উপমহাদেশে ইংরেজি ভাষা এক ধরনের সামাজিক ক্ষমতার প্রতীক। ভালো চাকরি, উচ্চশিক্ষা, কর্পোরেট জগৎ, বিদেশে সুযোগ সবকিছুর সঙ্গে ইংরেজি জড়িয়ে গেছে। অনেক পরিবারে শিশুরা নিজের মাতৃভাষার চেয়ে ইংরেজিতে কথা বললে বেশি “স্মার্ট” হিসেবে বিবেচিত হয়।

শুধু ভাষা নয়, পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাই অনেকাংশে ব্রিটিশ প্রশাসনিক প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল সৃজনশীল গবেষক তৈরি করা নয়, বরং clerk, হিসাবরক্ষক ও নিম্নস্তরের প্রশাসনিক কর্মচারী তৈরি করা। এজন্য মুখস্থভিত্তিক শিক্ষা, পরীক্ষাকেন্দ্রিক মূল্যায়ন এবং নির্দেশ মেনে চলার সংস্কৃতি গড়ে ওঠে।

আজও বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানে দেখা যায়:

* GPA নির্ভর প্রতিযোগিতা
* সৃজনশীলতার সংকট
* চাকরিমুখী শিক্ষা
* পরীক্ষাকেন্দ্রিক মানসিকতা

অনেক শিক্ষার্থী বছরের পর বছর শুধু পরীক্ষার জন্য পড়ে, কিন্তু বাস্তব দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। এটা কেবল বর্তমানের সমস্যা নয়, এর শিকড় ঔপনিবেশিক শিক্ষা কাঠামোর ভেতরে।

ব্রিটিশদের তৈরি আমলাতন্ত্রও আজ পর্যন্ত টিকে আছে। Indian Civil Service বা ICS ছিল এমন এক প্রশাসনিক ব্যবস্থা যেখানে কর্মকর্তা জনগণের “সেবক” কম, শাসক বেশি ছিল। জনগণ থেকে দূরত্ব, কাগজপত্রের জটিলতা, অনুমতির পর অনুমতি, ফাইল ঘোরানো সবকিছুই ছিল নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার উপায়।

আজও দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশে সরকারি অফিসে গেলে মানুষ “সেবা” নয়, বরং “ক্ষমতা” অনুভব করে। সাধারণ নাগরিককে ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়াতে হয়, অসংখ্য সিল-সিগনেচার নিতে হয়। “লাল ফিতার দৌরাত্ম্য” শব্দটি আসলে সেই colonial bureaucracy-এরই উত্তরাধিকার।

পুলিশ ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা দেখা যায়। ব্রিটিশ আমলে পুলিশের মূল কাজ ছিল জনগণকে নিরাপত্তা দেওয়া নয়, বরং বিদ্রোহ দমন ও শাসন টিকিয়ে রাখা। বিশেষ করে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের পর পুলিশকে আরও কঠোর ও কেন্দ্রীভূত করা হয়।

আজও উপমহাদেশের বহু মানুষ পুলিশকে বন্ধু হিসেবে নয়, ভয় হিসেবে দেখে। অনেক ক্ষেত্রে পুলিশের আচরণে ঔপনিবেশিক মানসিকতার ছাপ দেখা যায়। জনগণের সঙ্গে দূরত্ব, ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক প্রভাব সবকিছুই সেই পুরনো কাঠামোর ধারাবাহিকতা।

ভূমি ব্যবস্থায় ব্রিটিশদের প্রভাব ছিল ভয়াবহ। ১৭৯৩ সালের Permanent Settlement-এর মাধ্যমে জমিদারি ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল নিয়মিত রাজস্ব আদায় নিশ্চিত করা। ফলে একদিকে জমিদার শ্রেণি ধনী হয়, অন্যদিকে কৃষক ক্রমশ ঋণ ও দারিদ্র্যের ফাঁদে পড়ে।

বাংলার দুর্ভিক্ষগুলোর পেছনেও ব্রিটিশ অর্থনৈতিক নীতির বড় ভূমিকা ছিল। ১৯৪৩ সালের Bengal Famine-এ প্রায় ২০ থেকে ৩০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। অথচ সেই সময়ও খাদ্য রপ্তানি চলছিল। ইতিহাসবিদ Amartya Sen দেখিয়েছেন, এটি শুধু প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না, বরং প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও নীতিগত সমস্যার ফল।

সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার হলো, ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার পরও অনেক South Asian elite সেই একই colonial mindset ধরে রেখেছে। অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের সংস্কৃতি, ভাষা বা ঐতিহ্যের চেয়ে পশ্চিমা জিনিসকে বেশি “উন্নত” মনে করা হয়। ফর্সা চামড়া, ইংরেজি উচ্চারণ, বিদেশি ডিগ্রি এখনো সামাজিক মর্যাদার অংশ হয়ে আছে।

এটা শুধু সাংস্কৃতিক প্রভাব নয়, এটি মানসিক উপনিবেশও বলা যায়।

ব্রিটিশ শাসনের আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হলো রাজধানী ও বড় শহরকেন্দ্রিক উন্নয়ন। তারা যেসব অঞ্চলকে অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক মনে করত, সেখানেই অবকাঠামো গড়ে তুলত। ফলে গ্রাম ও ছোট শহরগুলো পিছিয়ে পড়ে।

আজও দেখা যায়:

* রাজধানীভিত্তিক উন্নয়ন
* গ্রাম থেকে শহরে অতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ
* অর্থনৈতিক বৈষম্য
* কেন্দ্রীয়করণ

ঢাকা, দিল্লি, করাচি বা মুম্বাইয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপের পেছনেও ঐতিহাসিক কারণ আছে।

তাহলে প্রশ্ন আসে, ব্রিটিশরা কি শুধু ক্ষতিই করেছে?

ইতিহাস এতটা সাদা-কালো নয়। তারা আধুনিক প্রশাসন, রেল, ডাকব্যবস্থা, কিছু বিশ্ববিদ্যালয়, আইনি কাঠামোও তৈরি করেছে। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এগুলোর বড় অংশই তৈরি হয়েছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের স্বার্থে। পরে স্বাধীন দেশগুলো সেগুলো নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করেছে।

সমস্যা হলো, স্বাধীনতার পরও অনেক colonial structure অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। পতাকা বদলেছে, শাসক বদলেছে, কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে চিন্তার কাঠামো বদলায়নি।

আজও যখন:

* শিক্ষাকে শুধু চাকরির মাধ্যম ভাবা হয়,
* ইংরেজিকে শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীক ধরা হয়,
* প্রশাসন জনগণের সেবকের বদলে ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে ওঠে,
* ধর্ম ও পরিচয় দিয়ে রাজনীতি করা হয়,
* পুলিশকে জনগণের বন্ধু নয়, ভয় মনে হয়,

তখন বুঝতে হবে, ব্রিটিশরা হয়তো ভৌগোলিকভাবে চলে গেছে, কিন্তু তাদের তৈরি অনেক কাঠামো এখনো উপমহাদেশের ভেতরে বেঁচে আছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন আর “ব্রিটিশরা কী করেছে” নয়।

বরং প্রশ্ন হলো, স্বাধীনতার এত দশক পরও আমরা কেন সেই ঔপনিবেশিক মানসিকতা ও কাঠামো পুরোপুরি ভাঙতে পারিনি?

 

ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন: