হামে শিশুমৃত্যুর ভয়াবহ মিছিল—বাংলাদেশে সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মৃত্যু এক হাজার ছাড়াল


নিউজ ডেক্স প্রকাশের সময় : সেপ্টেম্বর ১৪, ২০২৬, ৬:৫৭ অপরাহ্ন
হামে শিশুমৃত্যুর ভয়াবহ মিছিল—বাংলাদেশে সন্দেহভাজন ও নিশ্চিত মৃত্যু এক হাজার ছাড়াল

বাংলাদেশে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে হামের প্রাদুর্ভাব। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নিশ্চিত হাম এবং হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সম্মিলিত সংখ্যা ১,০০৯ জনে পৌঁছেছে। আক্রান্তদের বড় অংশ শিশু হওয়ায় দেশজুড়ে পরিবারগুলোর মধ্যে উদ্বেগ ও আতঙ্ক বাড়ছে।

সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ১,১৬৫ জন সন্দেহভাজন রোগী চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে যান এবং তাঁদের মধ্যে ১,১১২ জনকে ভর্তি করা হয়। bdnews24.com-এর DGHS-ভিত্তিক প্রতিবেদন⁠ অনুযায়ী, দেশে সন্দেহভাজন হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৪৫ এবং পরীক্ষাগারে নিশ্চিত রোগী শনাক্ত হয়েছে ১৯ হাজার ৯৩৩ জন।

নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন মৃত্যু কত?

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী—

  • পরীক্ষাগারে নিশ্চিত হাম রোগে মৃত্যু হয়েছে ১০০ জনের;
  • হাম-সদৃশ উপসর্গ নিয়ে সন্দেহভাজন মৃত্যু হয়েছে ৯০৯ জনের;
  • দুই শ্রেণি মিলিয়ে মোট মৃত্যু ১,০০৯ জন;
  • মোট সন্দেহভাজন রোগী ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৪৫ জন;
  • পরীক্ষাগারে নিশ্চিত রোগী ১৯ হাজার ৯৩৩ জন;
  • হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন মোট ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০৫ জন;
  • চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল ছেড়েছেন ১ লাখ ৪২ হাজার ৮৮৮ জন।

সব রোগীর পরীক্ষাগার পরীক্ষা করা সম্ভব না হওয়ায় সন্দেহভাজন মৃত্যুকে নিশ্চিত হামজনিত মৃত্যু হিসেবে সরাসরি গণ্য করা যায় না। তবে বিপুলসংখ্যক মানুষের একই ধরনের উপসর্গ এবং হাসপাতালের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ পরিস্থিতির ভয়াবহতা তুলে ধরছে।

বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাব

,বর্তমান সময়ে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাম প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি হয়েছে। একসময় রোগটি নির্মূলের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া দেশটি এখন টিকাদানের ঘাটতি, টিকা সরবরাহে সমস্যা এবং স্বাস্থ্যসেবার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়ার ভয়াবহ পরিণতি ভোগ করছে।

শিশুরাই সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, অপুষ্টিতে ভোগা শিশু, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম এমন ব্যক্তি এবং নিয়মিত টিকা না পাওয়া শিশুরা গুরুতর জটিলতার বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

কীভাবে তৈরি হলো এই ভয়াবহ সংকট?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে হাম–রুবেলা টিকার দেশব্যাপী সরবরাহে ঘাটতি এবং নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় শিশুদের মধ্যে বড় ধরনের রোগ প্রতিরোধের ঘাটতি তৈরি হয়।

রাজনৈতিক অস্থিরতা, টিকা সংগ্রহে বিলম্ব, নির্ধারিত কর্মসূচি স্থগিত হওয়া এবং অনেক শিশুর নিয়মিত দুই ডোজ টিকা না পাওয়াকে বর্তমান প্রাদুর্ভাবের প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা।

নয় মাসের কম বয়সী শিশুরা নিয়মিত টিকা নেওয়ার নির্ধারিত বয়সে পৌঁছানোর আগেই আক্রান্ত হচ্ছে—যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ঘনবসতি ও মানুষের ব্যাপক চলাচলের কারণে রোগটি দ্রুত এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে।

হাসপাতালে রোগীর চাপ, সঙ্গে ডেঙ্গুর প্রকোপ

হাম রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকায় দেশের হাসপাতালগুলোতে শিশু রোগীদের প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়েছে। একই সময়ে ডেঙ্গুর সংক্রমণও দ্রুত বাড়ায় হাসপাতালের শয্যা, চিকিৎসক, নার্স ও জরুরি চিকিৎসাসামগ্রীর ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ছে।

হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। গুরুতর অবস্থায় এটি নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, শ্রবণশক্তি হ্রাস, মস্তিষ্কে প্রদাহ এবং মৃত্যুর কারণ হতে পারে। অপুষ্টিতে ভোগা ও টিকা না পাওয়া শিশুদের জটিলতার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য

প্রায় দুই কোটি শিশুকে জরুরি টিকা

প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, UNICEF ও Gavi-এর সহযোগিতায় দেশব্যাপী জরুরি হাম–রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম চালিয়েছে। এপ্রিল মাসে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ উপজেলা দিয়ে শুরু হওয়া কর্মসূচি পরে সারাদেশে সম্প্রসারণ করা হয় এবং প্রায় দুই কোটি শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে।

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতেও ছয় মাস থেকে পাঁচ বছরের কম বয়সী ১ লাখ ৬৬ হাজারের বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। সেখানে লক্ষ্যভুক্ত শিশুদের ৯৩ শতাংশের বেশি টিকার আওতায় এসেছে বলে WHO জানিয়েছে⁠।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু এককালীন টিকাদান অভিযান যথেষ্ট নয়। নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি পুনরুদ্ধার, পর্যাপ্ত টিকার মজুত, রোগী শনাক্তকরণ, পরীক্ষাগার সক্ষমতা এবং হাসপাতালের চিকিৎসাব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে।

অভিভাবকদের প্রতি জরুরি সতর্কতা

শিশুর জ্বর, কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চোখ লাল হওয়া বা শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত দুর্বলতা, খেতে না পারা, পানিশূন্যতা বা অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা প্রয়োজন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, হাম প্রতিরোধের সবচেয়ে নিরাপদ ও কার্যকর উপায় হলো নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী হামযুক্ত টিকার দুই ডোজ নিশ্চিত করা।

প্রতিরোধযোগ্য একটি রোগে এক হাজারের বেশি নিশ্চিত ও সন্দেহভাজন মৃত্যু বাংলাদেশের টিকাদান ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য ভয়াবহ সতর্কসংকেত। এখনই কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আরও বহু পরিবারকে সন্তান হারানোর অসহনীয় শোক বহন করতে হতে পারে।

ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন: