তেহরানের কৌশল: ‘রণক্ষেত্রে নতুন তাস’


নিউজ ডেক্স প্রকাশের সময় : এপ্রিল ২২, ২০২৬, ১০:৫৩ পূর্বাহ্ন
তেহরানের কৌশল: ‘রণক্ষেত্রে নতুন তাস’

নভেম্বর ২০২৪-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং ২০২৫ সালের চরম উত্তেজনার পর, ২০২৬ সালের এপ্রিলে এসে মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়া এক ভয়াবহ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়েছে।

তেহরানের রাজপথে যখন একজন ইরানি ধর্মীয় নেতা ধ্বংসপ্রাপ্ত সিনাগগের ধ্বংসাবশেষের মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন, তখন সেই দৃশ্যটি কেবল একটি স্থাপত্যের বিনাশ নয়, বরং গত কয়েক দশকের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পতনের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে পাকিস্তান যখন একটি সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার আয়োজক হিসেবে নিজেকে প্রস্তুত করছে, তখন যুদ্ধের দামামা আগের চেয়েও জোরে বাজছে।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকারের সাম্প্রতিক বক্তব্য বিশ্বজুড়ে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে, যদি আমেরিকার সাথে পুনরায় যুদ্ধ শুরু হয়, তবে তেহরান রণক্ষেত্রে ‘নতুন তাস( New cards on the battlefield) ব্যবহার করার জন্য প্রস্তুত। এই ‘নতুন তাস’ বলতে ইরান তার উন্নত ড্রোন প্রযুক্তি, প্রক্সি নেটওয়ার্ক কিংবা সম্ভবত এমন কোনো কৌশলগত অস্ত্রের দিকে ইঙ্গিত করছে যা আগে ব্যবহৃত হয়নি।

ইরানের এই অনমনীয় মনোভাবের মূল কারণ হলো আগামী বুধবার শেষ হতে চলা যুদ্ধবিরতি। এই সময়সীমা পার হওয়ার পর কী ঘটবে, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে চরম অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।

ওয়াশিংটনের অবস্থান: ট্রাম্পের কঠোর হুঁশিয়ারি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যেই পরিস্থিতির উত্তাপ বাড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন যে, এই যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বৃদ্ধির সম্ভাবনা ‘অত্যন্ত ক্ষীণ। ট্রাম্প প্রশাসনের এই হার্ডলাইন নীতি মূলত ইরানকে সর্বোচ্চ চাপে রাখার কৌশলের অংশ। অন্যদিকে, মার্কিন গণমাধ্যম সূত্রে জানা গেছে যে, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স মঙ্গলবার পাকিস্তানে পৌঁছাবেন।

আমেরিকা আলোচনার টেবিলে বসার ইঙ্গিত দিলেও তাদের সামরিক প্রস্তুতি ও প্রেসিডেন্টের বক্তব্য ভিন্ন কথা বলছে। ভ্যান্সের এই সফর মূলত পাকিস্তানকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ব্যবহার করে ইরানকে একটি নির্দিষ্ট চুক্তিতে বাধ্য করার শেষ চেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ইসলামাবাদ: শান্তির আশায় প্রস্তুতির শহর

পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদ এখন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। রাস্তার মোড়ে মোড়ে ‘ইসলামাবাদ টকস(Islamabad Talks) লেখা পোস্টার শোভা পাচ্ছে। কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং চেকপয়েন্টের মধ্য দিয়ে শহরটি সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার জন্য নিজেকে সাজিয়েছে।

তবে এই প্রস্তুতির মধ্যেও এক ধরণের থমথমে ভাব বিরাজ করছে। তেহরান এখনো নিশ্চিত করেনি যে তারা ইসলামাবাদে তাদের প্রতিনিধি দল পাঠাবে কি না। পাকিস্তানের জন্য এটি একটি বড় পরীক্ষা। একদিকে তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র চীনের চাপ, অন্যদিকে আমেরিকার সাথে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা সব মিলিয়ে ইসলামাবাদ এখন এক কঠিন রণক্ষেত্র।

ইরানের অভ্যন্তরীণ উদ্বেগ ও জনমত

তেহরান থেকে প্রাপ্ত রিপোর্ট অনুযায়ী, সাধারণ ইরানিদের মধ্যে শান্তি আলোচনা নিয়ে এক ধরণের ভীতি কাজ করছে। তাদের ভয় হলো, এই আলোচনার মাধ্যমে আমেরিকার এমন কিছু দাবি ইরানকে মেনে নিতে বাধ্য করা হবে, যা দেশটির সার্বভৌমত্ব বা জাতীয় মর্যাদার পরিপন্থী।

ইরানিরা মনে করছেন, পশ্চিমারা এমন কিছু শর্ত চাপিয়ে দিতে পারে যা তাদের দীর্ঘদিনের পরমাণু কর্মসূচি বা আঞ্চলিক প্রভাবকে সমূলে বিনাশ করবে। এই অবিশ্বাসের কারণেই তেহরান আলোচনার টেবিলে বসার ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে দেরি করছে।

চীনের ভূমিকা ও হরমুজ প্রণালীর গুরুত্ব

এশিয়ায় ক্ষমতার অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই সংকটে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছেন। তার মতে, ‘হরমুজ প্রণালী‘দিয়ে ‘স্বাভাবিক যান চলাচল (‘Normal traffic) বজায় রাখা জরুরি।

বিশ্বের জ্বালানি তেলের একটি বিশাল অংশ এই প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। যদি যুদ্ধ শুরু হয় এবং ইরান এই প্রণালী বন্ধ করে দেয়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়বে। চীন তার নিজের জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে এই অঞ্চলে কোনো বড় সংঘাত চায় না। শি জিনপিংয়ের এই বিবৃতি মূলত ইরান ও আমেরিকা উভয় পক্ষকেই সংযত থাকার এক পরোক্ষ বার্তা।

২০২৬-এর এই সংকটের প্রভাব

২০২৬ সালের ২০ এপ্রিলের এই চিত্রটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, কূটনীতি যখন ব্যর্থ হয়, তখন ধ্বংসাবশেষই অবশিষ্ট থাকে। তেহরানের সেই ধ্বংসপ্রাপ্ত সিনাগগটি হতে পারে একটি বৃহত্তর ধ্বংসযজ্ঞের শুরু।

আলোচনার সম্ভাব্য ফলাফল

যদি ভ্যান্স এবং ইরানি প্রতিনিধি দল ইসলামাবাদে বসতে সম্মত হয় এবং যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ে, তবে বিশ্ব অন্তত কিছুদিনের জন্য স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবে।

বুধবারের মধ্যে কোনো সিদ্ধান্ত না এলে মধ্যপ্রাচ্য এক সর্বাত্মক যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাবে, যার প্রভাব পড়বে দক্ষিণ এশিয়া থেকে শুরু করে ইউরোপ পর্যন্ত।

পাকিস্তান এখন শান্তির পাদদেশ হতে চায়, কিন্তু যুদ্ধের মেঘ এতটাই ঘনীভূত যে রোদের দেখা পাওয়া দুষ্কর। ইরানের ‘নতুন তাস’ বনাম ট্রাম্পের ‘অসম্ভব’ মেয়াদ বৃদ্ধির এই দুই মেরুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে বিশ্ব।

ইসলামাবাদের সেই পোস্টারগুলো কি শেষ পর্যন্ত সার্থকতা পাবে, নাকি সেগুলো ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়বে, তা নির্ভর করছে আগামী ৪৮ ঘণ্টার কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপের ওপর।

শান্তি এখন কেবল আলোচনার টেবিলে নয়, বরং হরমুজ প্রণালীর শান্ত জল আর ইসলামাবাদের কঠোর নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে আটকে আছে। বিশ্ববাসী এখন তাকিয়ে আছে জেডি ভ্যান্সের পাকিস্তান সফর এবং তেহরানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের দিকে।

সূত্র: বিবিসি, এএন

ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন: