

অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নতুন রাষ্ট্রদূত হিসেবে অভিজ্ঞ কূটনীতিক লিউ জিনসং (Liu Jinsong)-কে ক্যানবেরায় পাঠিয়েছে চীন। অস্ট্রেলিয়ার কয়েকটি সংবাদমাধ্যম তাকে তার দৃঢ় ও কৌশলী কূটনৈতিক অবস্থানের কারণে ‘Asia enforcer’ বা ‘এশিয়া এনফোর্সার’ হিসেবে বর্ণনা করছে। এটি তার কোনো সরকারি উপাধি নয়, বরং তার কূটনৈতিক ধরন বোঝাতে গণমাধ্যমে ব্যবহৃত একটি বর্ণনা।
চীনের ১৬তম রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব নিতে লিউ জিনসং ২৫ আগস্ট অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছেছেন। এর আগে তিনি চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের Department of Asian Affairs-এর Director-General হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এশিয়ার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে বেইজিংয়ের সম্পর্ক পরিচালনায় তার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা রয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছে দেওয়া বক্তব্যে লিউ বলেন, চীন ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে কোনো ঐতিহাসিক বিরোধ বা মৌলিক স্বার্থের সংঘাত নেই এবং দুই দেশের অর্থনীতি পরস্পরের পরিপূরক। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে পারস্পরিক পার্থক্য ও প্রত্যাশা সঠিকভাবে পরিচালনা করা প্রয়োজন। তিনি চীনের জাতীয় স্বার্থ রক্ষার পাশাপাশি চীন–অস্ট্রেলিয়া সামগ্রিক কৌশলগত অংশীদারত্বকে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলেন।
কেন লিউ জিনসং গুরুত্বপূর্ণ?
লিউ দীর্ঘদিন ধরে চীনের এশিয়া নীতির গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। তিনি জাপান, ভারত, থাইল্যান্ড ও যুক্তরাজ্য-সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক দায়িত্বে কাজ করেছেন এবং আফগানিস্তানে চীনের রাষ্ট্রদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তাইওয়ান, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নীতিসহ বিভিন্ন স্পর্শকাতর ইস্যুতেও তার কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে।
২০২৫ সালে চীন–জাপান উত্তেজনার সময় জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মাসাকি কানাইয়ের সঙ্গে লিউয়ের বৈঠক ব্যাপক আলোচনায় আসে। বৈঠকের পর প্রকাশিত একটি ভিডিও ও ছবিতে জাপানি কর্মকর্তাকে লিউয়ের সামনে মাথা নত অবস্থায় দেখা যায়। বিষয়টি নিয়ে টোকিও বেইজিংয়ের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেছিল। সেই ঘটনার পর থেকেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে লিউয়ের কঠোর কূটনৈতিক ভাবমূর্তি আরও আলোচিত হয়।
ক্যানবেরায় তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
গত কয়েক বছরে চীন ও অস্ট্রেলিয়ার বাণিজ্যিক সম্পর্ক অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে। আগের উত্তেজনার সময় প্রায় ২০ বিলিয়ন অস্ট্রেলিয়ান ডলারের রপ্তানি চীনা বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা ও বিধিনিষেধের প্রভাবে পড়েছিল। বর্তমানে মন্ত্রী পর্যায়ের সংলাপ এবং বাণিজ্য পুনরুদ্ধার হলেও দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত অবিশ্বাস এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
বিশেষ করে তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর, AUKUS, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ সম্পদ, চীনা বিনিয়োগ, মানবাধিকার এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার নিরাপত্তা জোট—এসব বিষয়ে বেইজিং ও ক্যানবেরার অবস্থানের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার সাম্প্রতিক আঞ্চলিক সামরিক তৎপরতা এবং দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে অবস্থানও বেইজিং গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, লিউ জিনসংয়ের নিয়োগের মাধ্যমে বেইজিং এমন একজন কূটনীতিককে ক্যানবেরায় পাঠিয়েছে, যিনি একদিকে অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও রাজনৈতিক সংলাপ সচল রাখতে পারবেন, অন্যদিকে চীনের কৌশলগত স্বার্থের প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান নেবেন। UTS-এর Australia-China Relations Institute-ও তার কূটনৈতিক যোগাযোগকে তুলনামূলকভাবে forceful বা দৃঢ় বলে উল্লেখ করেছে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত শিয়াও ছিয়ান (Xiao Qian)-এর সময়ে দুই দেশের সম্পর্ক গভীর সংকট থেকে বেরিয়ে কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছিল। এখন লিউ জিনসংয়ের দায়িত্ব হবে সেই স্থিতিশীলতা ধরে রাখা—তবে একই সঙ্গে তাইওয়ান, AUKUS, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রভাব নিয়ে ক্রমবর্ধমান মতপার্থক্য সামাল দেওয়া।
AusBangla News-এর বিশ্লেষণ: লিউ জিনসংয়ের নিয়োগ শুধু নিয়মিত কূটনৈতিক বদলি হিসেবে দেখার সুযোগ কম। এশিয়ার ভূরাজনীতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এমন একজন কর্মকর্তাকে ক্যানবেরায় পাঠানো ইঙ্গিত দিচ্ছে, অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে সম্পর্ককে অর্থনীতি ও বাণিজ্যের পাশাপাশি বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অংশ হিসেবেও গুরুত্ব দিচ্ছে বেইজিং।














































আপনার মতামত লিখুন :