

অস্ট্রেলিয়ায় আগামী তিন বছরে সাত লাখ ৫০ হাজারের বেশি অস্থায়ী অভিবাসী কমানোর একটি কঠোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে ডানপন্থী রাজনৈতিক দল One Nation। দলটির প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, গ্র্যাজুয়েট ভিসাধারী, অস্থায়ী দক্ষ কর্মী এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এটি One Nation-এর রাজনৈতিক প্রস্তাব—অস্ট্রেলীয় সরকারের গৃহীত বা কার্যকর কোনো অভিবাসননীতি নয়। প্রস্তাবটি নিয়ে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক, ব্যবসায়িক ও শিক্ষাক্ষেত্রে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।
পরিকল্পনায় কী রয়েছে?
One Nation তিন বছরের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ার অস্থায়ী অভিবাসীর সংখ্যা সাত লাখ ৫০ হাজারের বেশি কমাতে চায়। পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে—
● আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো;
● পড়াশোনা শেষে পাওয়া গ্র্যাজুয়েট ভিসার সুযোগ সংকুচিত করা;
● অস্থায়ী দক্ষ কর্মীদের পরিবারের সদস্য আনার অধিকার সীমিত করা;
● নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দেশত্যাগ না করা অনিয়মিত অভিবাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর নিষেধাজ্ঞা;
● সামগ্রিক অস্থায়ী ভিসা ব্যবস্থায় বড় ধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ।
One Nation নেতা Pauline Hanson দাবি করেছেন, অস্থায়ী অভিবাসীর সংখ্যা ব্যাপকভাবে কমানো হলে আবাসন, হাসপাতাল, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামোর ওপর চাপ কমবে এবং অস্ট্রেলীয় নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য বড় উদ্বেগ
প্রস্তাবটি বাস্তবায়িত হলে অস্ট্রেলিয়ায় পড়াশোনা করতে আগ্রহী বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে পড়াশোনা শেষ করার পর কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ এবং স্থায়ী বসবাসের সম্ভাবনাও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা শিক্ষার্থীরা অস্ট্রেলিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শিক্ষার্থীর সংখ্যা আকস্মিকভাবে কমানো হলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর আয়, কর্মসংস্থান এবং আঞ্চলিক ক্যাম্পাসগুলোর কার্যক্রমও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
দক্ষ কর্মী ও তাঁদের পরিবারের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
One Nation-এর পরিকল্পনায় অস্থায়ী দক্ষ কর্মীদের পরিবারের সদস্য আনার সুযোগ সীমিত করার প্রস্তাব রয়েছে। সমালোচকদের মতে, পরিবার সঙ্গে নেওয়ার সুযোগ না থাকলে চিকিৎসক, নার্স, প্রকৌশলী, নির্মাণকর্মী ও অন্যান্য দক্ষ পেশাজীবীদের কাছে অস্ট্রেলিয়া কম আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
এর ফলে স্বাস্থ্যসেবা, বয়স্ক পরিচর্যা, কৃষি, নির্মাণ, হসপিটালিটি এবং আঞ্চলিক কর্মসংস্থানে বিদ্যমান শ্রমিকসংকট আরও তীব্র হতে পারে।
অর্থনীতিতে বড় ধাক্কার সতর্কতা
ব্যবসায়ী ও শিল্প সংগঠনগুলো সতর্ক করেছে, এত বিপুলসংখ্যক অস্থায়ী অভিবাসী কমানোর সিদ্ধান্ত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দুর্বল করতে পারে। বিশেষ করে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে শ্রমিকসংকট তৈরি হলে উৎপাদন ব্যয় এবং বাজারে খাদ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বয়স্ক পরিচর্যা ও স্বাস্থ্যসেবায় বিদেশি কর্মীদের ওপর নির্ভরতা থাকায় এই খাতগুলোও বড় ধরনের জনবল সংকটে পড়তে পারে। নির্মাণশিল্পে দক্ষ কর্মীর ঘাটতি বাড়লে সরকারের আবাসন নির্মাণ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
সমালোচকদের কেউ কেউ সতর্ক করেছেন, পরিকল্পনাটি হঠাৎ এবং পূর্ণমাত্রায় কার্যকর হলে অস্ট্রেলিয়ার অর্থনীতি মন্দার ঝুঁকিতেও পড়তে পারে।
অভিবাসন নিয়ে রাজনৈতিক লড়াই আরও তীব্র
আবাসন সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয়, হাসপাতাল ও অবকাঠামোর ওপর চাপের জন্য অভিবাসনকে দায়ী করে অস্ট্রেলিয়ায় রাজনৈতিক বক্তব্য ক্রমেই কঠোর হচ্ছে। তবে অর্থনীতিবিদ ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু অভিবাসীর সংখ্যা কমিয়ে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।
তাঁদের যুক্তি, অপর্যাপ্ত আবাসন নির্মাণ, অবকাঠামোয় বিনিয়োগের ঘাটতি এবং দীর্ঘমেয়াদি কর্মশক্তি পরিকল্পনার দুর্বলতাও বর্তমান সংকটের জন্য দায়ী।
One Nation-এর এই প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত সরকারি নীতিতে পরিণত হবে কি না, তা এখনো অনিশ্চিত। কিন্তু এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়েছে—আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী, দক্ষ কর্মী এবং অস্থায়ী ভিসাধারীদের ভবিষ্যৎ অস্ট্রেলিয়ার পরবর্তী বড় রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে থাকতে যাচ্ছে।












































আপনার মতামত লিখুন :