

এটাই আমার পৈতৃক বাড়ি। এই বাড়িতেই কেটেছে আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিনগুলো। প্রতি বছর Phoenix ব্র্যান্ডের সাইকেল বদলাতাম। সেই সাইকেল নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ , তখন মনে হতো, এই বাড়ি আর মা-বাবার ছায়া চিরকাল এমনই থাকবে। কত কিছু বদলানোর শখ ছিল তখন! আজ এত বছর পর মনে হচ্ছে, যদি কিছু ফিরিয়ে পাওয়ার সুযোগ থাকত, সেই পুরোনো সাইকেল আর মা-বাবার সঙ্গে কাটানো একটি দিনই চাইতাম।
সারাদিন বাড়িটা মানুষের আনাগোনায় মুখর থাকত। বাবার জমিতে ও ব্যবসায় অনেক মানুষ কাজ করতেন। বাবা ছিলেন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, সোজাসাপটা মানুষ। নিজের পরিশ্রমে তিনি গড়ে তুলেছিলেন তাঁর এক রাজ্য। বাইরে বাবা সামলাতেন সেই বিশাল কর্মজগৎ, ভেতরে মা আগলে রাখতেন সংসার ও মানুষগুলোকে।
প্রতিদিন মা ২৫ থেকে ৩৫ জনের জন্য রান্না করতেন। ভোরে উঠতেন, ঘুমাতে যেতেন রাতে, মাকে কখনো ক্লান্ত হতে দেখিনি। খাবার তৈরি পেয়েছি, দুধের গ্লাস হাতে পেয়েছি, প্রয়োজনের সময় মাকে পাশে পেয়েছি কিন্তু এসবের জন্য তাঁকে কতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে, কতটা বিশ্রাম ছেড়ে দিতে হয়েছে, তা কখনো ভাবিনি। আজ মনে হচ্ছে, তিনি নিশ্চয়ই ক্লান্ত হতেন, শুধু তাঁর ক্লান্তি বোঝার বয়স তখন আমার হয়নি।
মা নিয়মিত ধর্মীয় অনুশীলন, নামাজ পড়তেন, অনেক নারী আসতেন তাঁর কথা শুনতে। চেয়ার এগিয়ে দিলে বলতেন, “বাড়িতে অনেক কাজ, বসার সময় নেই।” অথচ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই শুনতেন। ফেরার তাড়া থাকলেও মায়ের কাছ থেকে যেন সহজে যেতে পারতেন না।আজ সেই দৃশ্য মনে পড়লে বুঝি, মা শুধু আমাদের সংসারেই আপন ছিলেন না; অন্য মানুষের জীবনেও তাঁর একটি আপন জায়গা ছিল।
বাড়ির সামনে আমার নিজের হাতে করা ফুলের বাগান ছিল। বড় একটি হাসনাহেনা গাছ সন্ধ্যায় সুবাস ছড়াত। আজও কোথাও সেই গন্ধ পেলে মনে হয়, আবার আমাদের উঠানে ফিরে গেছি।
চাষের জন্য ষাঁড় ছিল, দুধের জন্য গাভি। মা আমাকে ঘন করে জ্বাল দেওয়া দুধ খাওয়াতেন। একটি ঘর মৌসুমি ফল – কলা, আম, কাঁঠাল, ঋতু অনুযায়ী সেই ঘর ভরে থাকত। তখন এসব ছিল সাধারণ দিনের অংশ; আজ স্মৃতি।
প্রায় ৩০ বছর আগে বাড়িটি ছেড়ে এসেছি। মা-বাবা দুজনই আজ আর বেঁচে নেই। বাড়ির কাঠামো আছে, কিন্তু সেই কোলাহল নেই, বাবার গলা নেই, রান্নাঘরে মায়ের ব্যস্ত পায়ের শব্দ নেই।
সবচেয়ে বড় আক্ষেপ, ভালোবাসতাম, অথচ কোনোদিন মুখ ফুটে বলিনি, “মা, তোমাকে ভালোবাসি। বাবা, তোমাকে ভালোবাসি।” ভেবেছিলাম, বলার সময় থাকবে। বুঝিনি, সেই সময়ও একদিন শেষ হয়ে যায়।
আজ বাড়িটার দিকে তাকিয়ে শুধু মনে হচ্ছে, একবার যদি সেই দিনগুলো ফিরে পেতাম! মায়ের পাশে বসতাম, বাবার হাত ধরতাম, আর না-বলা কথাটি বলতাম।
মা, বাবা – তোমাদের খুব দেখতে ইচ্ছে করছে আর একবার “মা” “বাবা” বলে ডাকতে ইচ্ছে করেছে… আর শুনতে ইচ্ছে করেছে তোমাদের সাড়া !!!!














































আপনার মতামত লিখুন :