

যাকে খুশি মন্ত্রী করুন, প্রতিমন্ত্রী করুন, উপদেষ্টা করুন—চাইলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদেও বসান। নাগরিকেরা হয়তো দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলবেন, এটাই জাতির কপাল! কিন্তু আমলাতন্ত্রের মোজাইক সিঁড়িটাকে জংলি বাঁশের মই বানাবেন না, প্লিজ।
কথাটি ক্ষোভের। এর ভেতরে রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মৌলিক প্রশ্ন আছে: রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে কি প্রশাসনের পেশাদার ভিত্তিও বদলে যাবে? সরকার নিজের নীতি বাস্তবায়ন করবে, সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই নীতি বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো যদি ব্যক্তিগত আনুগত্যের ওপর দাঁড়ায়, তাহলে নাগরিকের সেবা ও ন্যায্যতার নিশ্চয়তা কোথায়?
নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নে যোগ্যতার জায়গা যখন পরিচয় দখল করে, তখন ক্ষতি শুধু একজন বঞ্চিত কর্মকর্তার হয় না। পুরো ব্যবস্থায় একটি বার্তা পৌঁছে যায়—ভালো কাজের চেয়ে ভালো যোগাযোগ বেশি কার্যকর। তখন দক্ষ মানুষ নিরুৎসাহিত হন, আর তোষামোদ হয়ে ওঠে এগিয়ে যাওয়ার কৌশল। এর মূল্য শেষ পর্যন্ত দেন সাধারণ মানুষ: একটি সনদের জন্য ঘুরে, একটি অভিযোগের প্রতিকার না পেয়ে, কিংবা প্রাপ্য সেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে।
তবে আমলাতন্ত্রের পেশাদারত্ব রক্ষার দাবি কোনো কর্মকর্তাকে দায়মুক্তি দেওয়ার দাবি নয়। প্রশাসনের ভেতরে দুর্নীতি, অদক্ষতা, হয়রানি কিংবা ক্ষমতার অপব্যবহার থাকলে তার তদন্ত ও প্রতিকার প্রয়োজন। শাস্তিও হতে হবে প্রমাণ ও ন্যায্য প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে। রাজনৈতিক আনুগত্য যেমন পদোন্নতির যোগ্যতা হতে পারে না, তেমনি রাজনৈতিক অপছন্দও শাস্তির ভিত্তি হতে পারে না।
সংস্কার অবশ্যই দরকার। অপ্রয়োজনীয় ধাপ কমাতে হবে, সেবা সহজ করতে হবে, সিদ্ধান্তের কারণ নথিভুক্ত করতে হবে এবং দায়িত্বে ব্যর্থ হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু সংস্কারের নামে নিয়ম সরিয়ে ব্যক্তির ইচ্ছাকে প্রতিষ্ঠা করলে পুরোনো সমস্যার সঙ্গে নতুন অনিশ্চয়তা যোগ হয়। একটি প্রতিষ্ঠান তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার নিয়ম ক্ষমতাবানের ক্ষেত্রেও কার্যকর থাকে।
মোজাইক সিঁড়ির উপমাটি সৌন্দর্যের জন্য নয়; এর অর্থ স্থায়িত্ব, ধারাবাহিকতা ও নির্ভরযোগ্যতা। সেই সিঁড়িতে ফাটল থাকলে মেরামত করুন। পিচ্ছিল হলে নিরাপদ করুন। কিন্তু এমন মই বসাবেন না, যার স্থায়িত্ব নির্ভর করে কে নিচ থেকে ধরে রেখেছেন তার ওপর।
সরকার আসবে, সরকার যাবে। প্রশাসনের দরজায় নাগরিকের প্রয়োজন থেকে যাবে। সেই দরজায় মানুষ যেন দলীয় পরিচয় ছাড়াই সেবা পান, অভিযোগ জানাতে পারেন এবং ন্যায্য সিদ্ধান্তের প্রত্যাশা করতে পারেন—এ নিশ্চয়তা রক্ষা করাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
ক্ষমতার পছন্দে পদ বণ্টন হতে পারে; কিন্তু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানকে সেই পছন্দের কাছে জিম্মি করা চলে না। সিঁড়িটা সবার জন্য রাখুন—কারও ব্যক্তিগত মই বানাবেন না।
কামরুল ইসলাম, প্রধান সম্পাদক














































আপনার মতামত লিখুন :