

ফুটবল উন্মাদনা আর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির জন্য বিশ্বজুড়ে দারুণ পরিচিত দক্ষিণ আমেরিকার দ্বিতীয় বৃহত্তম রাষ্ট্র আর্জেন্টিনা। তবে এই চেনা পরিচয়ের বাইরেও দেশটি মুসলিম উপস্থিতির দিক থেকে লাতিন আমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি জনপদ।
দীর্ঘ অভিবাসনের ইতিহাস, শত বছরের ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষা আর প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের মধ্য দিয়ে সেখানে গড়ে উঠেছে এক প্রাণবন্ত মুসলিম সমাজ। সংখ্যায় সংখ্যালঘু হলেও আর্জেন্টিনার মুসলমানরা দেশটির সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নিজেদের একটি স্বতন্ত্র ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।
‘দ্য অ্যাসোসিয়েশন অব রিলিজিয়াস ডেটা আর্কাইভস’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আর্জেন্টিনায় বর্তমানে প্রায় পাঁচ লাখ মুসলিমের বসবাস, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার এক শতাংশেরও বেশি। লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর মধ্যে এত বড় মুসলিম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি খুব কম দেশেই দেখা যায়।
ইতিহাসবিদদের মতে, পঞ্চদশ শতাব্দীতে স্প্যানিশ অভিযাত্রীদের হাত ধরে ‘মুরিশ-মরিস্কো’ মুসলিমদের মাধ্যমে এই অঞ্চলে ইসলামের প্রথম আগমন ঘটে। সে সময় স্পেনে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে অনেক মুসলিম নতুন জীবনের আশায় আর্জেন্টিনার বিভিন্ন অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন করেন। পরবর্তীতে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে এবং বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে সিরিয়া ও লেবানন থেকে বিপুলসংখ্যক আরব অভিবাসী আর্জেন্টিনায় পাড়ি জমান। তাঁদের আগমনেই মূলত এখানকার মুসলিম সমাজ আরও সুসংগঠিত ও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
আর্জেন্টিনায় ইসলামের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেওয়া শুরু হয় আশির দশকে। ১৯৮৩ সালে রাজধানী বুয়েনস আইরেসে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘আত-তাওহিদ’ মসজিদ, যাকে দেশটির প্রথম মসজিদ হিসেবে গণ্য করা হয়। এরপর ১৯৮৫ সালে নির্মিত ‘আল-আহমদ’ মসজিদটি ছিল সম্পূর্ণ ইসলামিক স্থাপত্যশৈলীতে তৈরি আর্জেন্টিনার প্রথম ধর্মীয় ভবন। ইসলামের এই বিকাশ আরও গতি পায় ১৯৯৬ সালে, যখন সৌদি আরবের অর্থায়নে নির্মিত হয় ‘কিং ফাহাদ ইসলামিক কালচারাল সেন্টার’। এটি বর্তমানে পুরো দক্ষিণ আমেরিকার বৃহত্তম ইসলামিক কমপ্লেক্স, যেখানে সুবিশাল মসজিদ ছাড়াও রয়েছে সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মনোরম পার্ক।
তবে আধুনিকতার এই যুগে এসে আর্জেন্টিনার মুসলিম সমাজ বেশ কিছু নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। নতুন প্রজন্মের একটি বড় অংশ স্প্যানিশ ভাষাভাষী হওয়ায় মূল আরবি ভাষা ও গভীর ইসলামি জ্ঞানের সাথে তাদের সংযোগ কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ছে। এর পাশাপাশি স্প্যানিশ ভাষায় নির্ভরযোগ্য ইসলামি সাহিত্য ও গবেষণামূলক বইয়ের সংকট এবং স্থানীয় গণমাধ্যমে ইসলাম সম্পর্কে ইতিবাচক প্রচারের অভাব নতুন প্রজন্মের ধর্মীয় পরিচয় ধরে রাখার পথকে কিছুটা কঠিন করে তুলেছে।
এত সব প্রতিকূলতার পরও শত বছরের গৌরবময় ইতিহাস, সুদৃঢ় প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি এবং নিজস্ব ধর্মীয় ঐতিহ্য আর্জেন্টিনার মুসলিম সমাজকে আজও টিকিয়ে রেখেছে। স্থানীয় বিশ্লেষকদের মতে, সময়োপযোগী আধুনিক শিক্ষা, স্প্যানিশ ভাষায় ইসলামি গবেষণা এবং দাওয়াহ কার্যক্রম আরও জোরদার করা সম্ভব হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যেও ইসলামের মূল সুমহান মূল্যবোধ ও ঐতিহ্য অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে বিকশিত হবে।














































আপনার মতামত লিখুন :