

হুট করে রাত নেমে আসে। আলো থাকে না। শুধু অন্ধকার ছড়ায় ধীরে ধীরে। ইতিহাসও তেমন। একদিন যে নাম উচ্চারিত হয়েছিল প্রবল শক্তিতে, আরেকদিন সেই নাম নীরবতার ভিতরে ডুবে যায়। কথা কমে যায়। আলোচনার টেবিল ফাঁকা হয়। প্রশ্ন ভেসে থাকে। উত্তর আসে না।
শেখ হাসিনা—এক সময় যার উপস্থিতি মানেই ছিল রাজনীতির কেন্দ্র। যার প্রতিটি সিদ্ধান্ত ঘিরে তৈরি হতো বিতর্ক, আলোচনা, উত্তাপ। তিনি ছিলেন প্রভাবের অন্য নাম। ক্ষমতার প্রতীক। দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার অবস্থান ছিল অপ্রতিদ্বন্দ্বী। কিন্তু আজ যেন সেই অবস্থান ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে আলোচনার কেন্দ্র থেকে। যেন তিনি আছেন, আবার নেই।
একটা সময় ছিল যখন দেশের প্রতিটি বড় রাজনৈতিক প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হতো তার দিকে তাকিয়ে। তার বক্তব্য ছিল চূড়ান্ত। তার সিদ্ধান্ত ছিল দিকনির্দেশনা। বিরোধীরা তাকে ঘিরেই নিজেদের অবস্থান তৈরি করত। আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তার নাম ছিল পরিচিত। উন্নয়নের গল্পে তার ভূমিকা বারবার সামনে এসেছে। অবকাঠামো। অর্থনীতি। নারীর ক্ষমতায়ন। সবখানেই তার উপস্থিতি দৃশ্যমান ছিল।
কিন্তু রাজনীতি স্থির নয়। সময় বদলায়। প্রেক্ষাপট বদলায়। মানুষের মনও বদলায়। যে শক্তি একদিন দৃঢ় মনে হতো, তা একসময় প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। এই পরিবর্তনের মাঝেই দাঁড়িয়ে আজ শেখ হাসিনার অবস্থান যেন নতুনভাবে মূল্যায়িত হচ্ছে। তিনি কি আগের মতোই প্রভাবশালী? নাকি ধীরে ধীরে তিনি সরে যাচ্ছেন আলোচনার মূল টেবিল থেকে?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ফিরে তাকাতে হয় তার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রার দিকে। সংগ্রাম ছিল। নির্বাসন ছিল। প্রত্যাবর্তন ছিল। ক্ষমতায় আসার পর তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন দৃঢ় নেতৃত্ব হিসেবে। কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হননি। বিরোধিতাকে সামলেছেন নিজের মতো করে। এই দৃঢ়তাই তাকে শক্তিশালী করেছে। আবার এই দৃঢ়তাই তাকে সমালোচনার মুখেও ফেলেছে।
সময়ের সাথে সাথে রাজনৈতিক পরিবেশে তৈরি হয়েছে নতুন বাস্তবতা। তরুণ প্রজন্মের চিন্তা ভিন্ন। তাদের চাহিদা ভিন্ন। তারা শুধু উন্নয়নের পরিসংখ্যান দেখে না। তারা চায় অংশগ্রহণ। চায় স্বচ্ছতা। চায় কণ্ঠের স্বাধীনতা। এই পরিবর্তিত বাস্তবতায় পুরোনো ধাঁচের রাজনীতি অনেক সময় খাপ খায় না। এখানেই তৈরি হয় দূরত্ব। নেতার সাথে জনগণের। কথার সাথে বাস্তবতার।
আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি বদলেছে। বৈশ্বিক রাজনীতি এখন আরও জটিল। নতুন শক্তি উঠে আসছে। পুরোনো সমীকরণ ভেঙে যাচ্ছে। এই পরিবর্তনের ভেতরে দাঁড়িয়ে প্রতিটি নেতাকেই নিজের অবস্থান নতুন করে নির্ধারণ করতে হয়। শেখ হাসিনার ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নয়। তিনি চেষ্টা করেছেন। কিন্তু সব চেষ্টা সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি।
দেশের ভেতরে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সবসময়ই ছিল। কিন্তু সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতার ভাষা বদলেছে। আগে যেখানে সরাসরি রাজনৈতিক বিতর্ক হতো, এখন সেখানে অনেক সময় তৈরি হয় অবিশ্বাস। সংলাপের জায়গা সংকুচিত হয়। আলোচনার টেবিল ফাঁকা হয়ে যায়। এই শূন্যতায় একজন নেতা যত শক্তিশালীই হোন, তার উপস্থিতি কমে আসে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো জনমানসের পরিবর্তন। মানুষ এখন দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানায়। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে মত প্রকাশ করে। তারা প্রশ্ন করে। তারা জবাব চায়। এই দ্রুতগতির যুগে নেতৃত্বের ধরনও বদলাতে হয়। যদি সেই পরিবর্তন না আসে, তাহলে ধীরে ধীরে দূরত্ব বাড়ে। আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরে যাওয়া শুরু হয়।
শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের চাপ স্পষ্ট। তার দীর্ঘ শাসনামলে অনেক সাফল্য এসেছে। আবার অনেক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। এই দুইয়ের মাঝেই তার বর্তমান অবস্থান দাঁড়িয়ে আছে। তিনি এখনো ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে তার অবস্থান আগের মতো উজ্জ্বল নয়।
রাজনীতির আরেকটি বাস্তবতা হলো উত্তরাধিকার। দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকা নেতাদের সামনে সবসময় একটি প্রশ্ন থাকে—তারপর কী? নতুন নেতৃত্ব কোথায়? নতুন ভাবনা কোথায়? যদি এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর না আসে, তাহলে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক শক্তি দুর্বল হতে থাকে। এই দুর্বলতা প্রকাশ পায় আলোচনার পরিসরে।
একসময় শেখ হাসিনার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল খবরের শিরোনাম। এখনো তিনি আলোচনায় আসেন। কিন্তু সেই আলোচনার তীব্রতা কমে গেছে। আগের মতো একক আধিপত্য আর নেই। বিভিন্ন ইস্যুতে এখন একাধিক কণ্ঠ শোনা যায়। নতুন মুখ উঠে আসে। নতুন বিতর্ক তৈরি হয়। এই বহুমাত্রিক পরিবেশে একজন নেতার অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে এটাও সত্য, ইতিহাস কখনো সরলরেখায় চলে না। কখনো পতন মনে হলেও তা সাময়িক হয়। আবার কখনো উত্থান দীর্ঘস্থায়ী হয় না। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক জীবনে বহু উত্থান-পতন এসেছে। তাই তার বর্তমান অবস্থানকে একমাত্রিকভাবে বিচার করা কঠিন। তিনি হারিয়ে যাচ্ছেন কি না, তা নির্ভর করছে সময়ের উপর। তার সিদ্ধান্তের উপর। জনগণের প্রতিক্রিয়ার উপর।
আজকের বাস্তবতায় তাকে নতুনভাবে ভাবতে হবে। সংলাপের দরজা খুলতে হবে। নতুন প্রজন্মের সাথে সংযোগ তৈরি করতে হবে। পরিবর্তিত বিশ্ব রাজনীতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। না হলে আলোচনার টেবিল থেকে তার দূরত্ব আরও বাড়তে পারে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি থেকে যায়। তিনি কি সত্যিই হারিয়ে যাচ্ছেন? নাকি তিনি নিজেকে নতুনভাবে গড়ে তোলার পথে আছেন? উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে নীরবতার ভেতরেও শব্দ থাকে। অন্ধকারের ভেতরেও আলো লুকিয়ে থাকে। ইতিহাস সেই আলো খুঁজে নেয় একদিন।
# statewatch








































আপনার মতামত লিখুন :