

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার মধ্যে চীন থেকে ইরানে রাসায়নিকবাহী জাহাজ পৌঁছানোর ঘটনায় নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল বাণিজ্যিক কার্যক্রম নয়; বরং বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক কৌশলের অংশ।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে অন্তত চারটি নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত ইরানি পতাকাবাহী জাহাজ নিজ দেশের বন্দরে নোঙর করেছে এবং আরও একটি জাহাজ উপকূলের কাছে অবস্থান করছে। চীনের ঝুহাই শহরের গাওলান বন্দর থেকে যাত্রা করা এসব জাহাজ মূলত রাসায়নিক পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হয়।
ধারণা করা হচ্ছে, জাহাজগুলোতে সোডিয়াম পারক্লোরেট নামের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাসায়নিক বহন করা হয়েছে, যা কঠিন জ্বালানিভিত্তিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিমাণ কাঁচামাল দিয়ে শত শত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি সম্ভব, যা ইরানের সামরিক সক্ষমতা ধরে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
মার্কিন নিষেধাজ্ঞা বিশ্লেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাতে ইরান দ্রুত তাদের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সূত্রও জানিয়েছে, ইরানের প্রায় অর্ধেক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা এখনো অক্ষত রয়েছে। ফলে নতুন করে কাঁচামাল আমদানি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, দেশটি আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও রাষ্ট্রায়ত্ত ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান শিপিং লাইন গ্রুপের অধীন জাহাজগুলো নজরদারি এড়াতে নানা কৌশল ব্যবহার করেছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বয়ংক্রিয় শনাক্তকরণ ব্যবস্থা (AIS) বন্ধ রাখা, ভুয়া গন্তব্য দেখানো এবং জাহাজের নাম পরিবর্তন করা যা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণকে জটিল করে তুলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চলমান সংঘাতে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের কারণে ইরানের মজুদ দ্রুত কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় উৎপাদন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে নতুন কাঁচামাল আমদানি ইরানকে আরও কিছুদিন সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা দিতে পারে।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ‘গোলবান’ ও ‘জাইরান’ নামের দুটি জাহাজের বহনক্ষমতা অনুযায়ী ইরান প্রায় ৭৮৫টি অতিরিক্ত ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির মতো কাঁচামাল পেতে পারে। এর ফলে তারা অন্তত এক মাস প্রতিদিন ১০ থেকে ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ অব্যাহত রাখতে সক্ষম হতে পারে।
চীনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। আনুষ্ঠানিকভাবে সামরিক সহায়তা অস্বীকার করলেও, বাণিজ্যিক পণ্যের আড়ালে এই ধরনের সরবরাহ অব্যাহত রাখার অভিযোগ রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এতে চীন একদিকে আন্তর্জাতিক চাপ এড়িয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্কও বজায় রাখছে।
তবে বিষয়টি বেইজিংয়ের জন্য জটিল ভারসাম্যেরও। কারণ, উপসাগরীয় অঞ্চলে চলমান সংঘাত এমন এক এলাকায় ঘটছে, যেখানে চীনের বিপুল বিনিয়োগ রয়েছে। ফলে এই কৌশল দীর্ঘমেয়াদে কতটা টেকসই হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকেরা।
সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ
এএন








































আপনার মতামত লিখুন :