রাশিয়ার অত্যাধুনিক ড্রোন এখন ইরানের হাতে


নিউজ ডেক্স প্রকাশের সময় : মার্চ ২৯, ২০২৬, ১০:২৯ পূর্বাহ্ন
রাশিয়ার অত্যাধুনিক ড্রোন এখন ইরানের হাতে

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক আকাশসীমায় এক ভয়াবহ পরিবর্তনের সংকেত পাওয়া যাচ্ছে। দীর্ঘ এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা ইরান-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের মধ্যে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে রাশিয়া।আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এপি-র এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদনে জানা গেছে, ইউক্রেন যুদ্ধে পরীক্ষিত এবং বর্তমানে আরও শক্তিশালী করা ‘শাহেদ’ ড্রোনের উন্নত সংস্করণ ইরানে পাঠাতে শুরু করেছে মস্কো। এই পদক্ষেপ কেবল পারস্য উপসাগরের সমর শক্তিকেই বদলে দিচ্ছে না, বরং মার্কিন ও তাদের মিত্র বাহিনীর বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক ‘অজেয়’ চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঐতিহাসিকভাবে ইরানই রাশিয়াকে ড্রোন সরবরাহ করে আসছিল, যা ইউক্রেন যুদ্ধে কিয়েভের জ্বালানি অবকাঠামো ধ্বংস করতে বড় ভূমিকা রেখেছে। তবে এখন পরিস্থিতি উল্টে গেছে। ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে রাশিয়া এই ড্রোনগুলোকে আমূল বদলে দিয়েছে। মার্কিন ও ইউরোপীয় গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, রাশিয়ার এই ‘রিটার্ন গিফট’ বা উন্নত সংস্করণের ড্রোন সরবরাহ তেহরানের সামরিক সক্ষমতাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

ধারণা করা হচ্ছে, আজারবাইজান সীমান্ত হয়ে মানবিক সহায়তার ছদ্মবেশে ট্রাকে করে এই ড্রোনের চালান ইরানে প্রবেশ করছে। যদিও ক্রেমলিন এই তথ্যকে ‘মিথ্যা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে, তবে যুদ্ধের ময়দান এবং গোয়েন্দা উপাত্ত ভিন্ন কথা বলছে।

আগেকার শাহেদ ড্রোনগুলো ছিল মূলত ধীরগতির এবং শব্দসাপেক্ষ। কিন্তু রাশিয়ার হাতে পড়ে এগুলো এখন বিবর্তিত হয়ে এক মারাত্মক মারণাস্ত্রে পরিণত হয়েছে। এই উন্নত সংস্করণে যুক্ত করা হয়েছে:

যা ড্রোনের গতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে, ফলে ইন্টারসেপ্টর মিসাইল দিয়ে এগুলোকে ভূপাতিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) নেভিগেশন: জিপিএস জ্যামিং বা সংকেত বিঘ্নিত করলেও এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে এটি নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম।

অ্যাডভান্সড জ্যামার-প্রতিরোধী ব্যবস্থা: পশ্চিমা ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেমকে ফাঁকি দেওয়ার সক্ষমতা।
স্টারলিংক ইন্টারনেট ডিভাইস: নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ এবং রিয়েল-টাইম ডাটা আদান-প্রদানের সুবিধা।

গত ২৪ থেকে ২৭ মার্চের ঘটনাবলি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মধ্যপ্রাচ্য এখন এক অগ্নিকুণ্ডে পরিণত হয়েছে।

১. কুয়েত বিমানবন্দরে হামলা: ড্রোন হামলায় কুয়েত বিমানবন্দরের রাডার ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়েছে এবং দীর্ঘ সময় সেখানে আগুন জ্বলছিল।

২. ইসরায়েল ও লেবানন সীমান্ত: হিজবুল্লাহর রকেট হামলায় ইসরায়েলি সেনা হতাহতের সংখ্যা বাড়ছে। অন্যদিকে, ইসরায়েল লেবাননের গুরুত্বপূর্ণ কাসমিয়া সেতু ধ্বংস করে দিয়েছে, যা ত্রাণ সরবরাহে বাধা সৃষ্টি করছে।

৩. হরমুজ প্রণালি ও জ্বালানি যুদ্ধ: ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দিচ্ছে। অন্যদিকে, ভারত ও থাইল্যান্ডের মতো দেশগুলো এই সংকটময় পরিস্থিতিতেও ইরানের সঙ্গে তেল ও গ্যাস চুক্তিতে সক্রিয় রয়েছে।

৪. পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত: ইরানের বুশেহর এবং নাতানজ পারমাণবিক কেন্দ্রের কাছে দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। যদিও তেজস্ক্রিয়তা ছড়ানোর খবর পাওয়া যায়নি, তবে উত্তেজনা তুঙ্গে।

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একদিকে আলোচনার প্রস্তাব দিচ্ছেন, অন্যদিকে ১৫ দফা শান্তি প্রস্তাবের মাধ্যমে ইরানকে চাপে রাখার চেষ্টা করছেন। তবে যুদ্ধের ময়দানে মার্কিন সেনাদের ক্ষয়ক্ষতি বেড়েই চলেছে। সৌদি আরবের মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে বিস্ফোরণ এবং মার্কিন রণতরি ‘জর্জ বুশ’ মোতায়েনের পরিকল্পনা ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, ওয়াশিংটন দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

তবে রাশিয়ার এই ড্রোন সরবরাহ মার্কিন পেন্টাগনের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অলিভিয়া ওয়েলস জনসম্মুখে ‘অভিযানের সফলতায় প্রভাব পড়বে না’ বললেও, সমরবিদরা মনে করছেন, রাশিয়ার উন্নত ড্রোনগুলো মার্কিন প্যাট্রিয়ট বা ইসরায়েলি আয়রন ডোম সিস্টেমকে ফাঁকি দিতে শুরু করলে মিত্র বাহিনীর আকাশসীমা অসুরক্ষিত হয়ে পড়বে।

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র যত বেশি জড়িয়ে পড়বে, ইউক্রেন ফ্রন্টে রাশিয়ার ওপর চাপ তত কমবে। পেন্টাগন ইতিমধ্যে ইউক্রেনের জন্য রাখা অস্ত্র মধ্যপ্রাচ্যে সরানোর কথা ভাবছে, যা সরাসরি পুতিনের লক্ষ্য পূরণ করছে।
তথ্য আদান-প্রদান: জার্মানির দাবি অনুযায়ী, রাশিয়া ইরানকে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে গোয়েন্দা তথ্য দিয়েও সহায়তা করছে। এর বিনিময়ে ইরান থেকে জ্বালানি এবং অন্যান্য কৌশলগত সুবিধা পাচ্ছে মস্কো।

এই যুদ্ধের প্রভাবে বিশ্ব বাণিজ্য ৮০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। ডব্লিউটিও (WTO) সতর্ক করেছে যে, হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ব অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে পড়বে। এরই মধ্যে তেলের দামের অস্থিরতা ফিলিপাইনের মতো দেশে জরুরি অবস্থা জারিতে বাধ্য করেছে।

পাকিস্তান, তুরস্ক এবং কাতার মধ্যস্থতার চেষ্টা করলেও যুদ্ধের গতি রুদ্ধ হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই। বিশেষ করে ইরানের নিরাপত্তা প্রধান আলী লারিজানি এবং বাসিজ কমান্ডার সোলাইমানির মৃত্যুর খবর (যদিও অসমর্থিত) ইরানকে আরও কঠোর প্রতিশোধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

রাশিয়ার উন্নত ড্রোন সরবরাহ কেবল একটি সামরিক লেনদেন নয়, এটি বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য পরিবর্তনের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। যদি এই ড্রোনগুলো কুয়েত বা ইসরায়েলের মতো জায়গায় রাডার ব্যবস্থা ধ্বংস করতে সফল হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের নিয়ন্ত্রণ চিরতরে মার্কিন বলয়ের বাইরে চলে যেতে পারে।

আগামী কয়েক সপ্তাহ নির্ধারণ করবে এই ড্রোন যুদ্ধ বিশ্বকে তৃতীয় মহাযুদ্ধের দিকে ঠেলে দেয় নাকি ট্রাম্পের ‘শান্তি প্রস্তাব’ শেষ পর্যন্ত কোনো টেবিল বৈঠক নিশ্চিত করতে পারে।

তথ্যসূত্র: এপি, আল-জাজিরা এবং স্থানীয় সংবাদ সংস্থা।

এএন

ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন: