যোগির ঘর থেকে আক্কাস যখন বাইরে এসে দাড়ায় তখন সাদা সাদা জোসনা ভেঙে পড়ছে গোপীবাগের অলিতে গলিতে। কুকুরের কান্না, বাংলা মদ আর গরুর ওলানের কাবাব মাথায় নিয়ে আক্কাস যখন রেললাইনের স্লিপেরের উপর দিয়ে উড়ে চলে তখন দুই পাশের বস্তির শিশুরা তাদের কান্না থামিয়ে গভীর ঘুমে, আর সিটিপল্লীর হিরোইনখোরগুলি নেশার টানে ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে থাকে চুরির ধান্দায়। “এয় মেরি দিল কাহি অর চল, গামকি দুনিয়া সে দিল ভর গায়া” গুন গুন করতে করতে আক্কাস দিলিপ কুমারের এই গানটার কথা ভাবে। ” হালায় হিরো বি আছিল একখান। দিলদা খুশ বি অহে আবর উদাসিন বি অহে” ভাবতে ভাবতে আক্কাস কখন যে সায়দাবাদ বাস টার্মিনালে এসে দাড়ায় টের পায়নি। রফিকের পানের দোকান থেকে একটা গাঁজার সিগারেট কিনে নেশাটা চাগান দিয়ে আক্কাস এগিয়ে চলে যাত্রাবাড়ীর দিকে। গাঁজায় টান দিলেই আক্কাসের কাছে হামিদা বানুর বোনের চোখ, যোগির বউয়ের নাভি সব একাকার হয়ে যায়। যোগির বউয়ের নাভির কথা বাহারের কাছ থেকে আক্কাস জানতে পারে কালুটোলার বস্তিতে কল্কিতে দম দিতে গিয়ে। ” হালায় জীবনে অমন মাল দেখিনাইক্কা, মাল তো না, জাইসা এক আগ, জ্বালা দেগা তুজকো”। বাহারের সাথে গোপীবাগের যোগীর ঘরে যাওয়া শুরু সেই থেকে। না, বাহার মিথ্যা বলেনি। যোগির বউ আক্কাসকে জ্বালাতে পারেনি তবে তার নাভির দিকে তাকালে আক্কাসের হামিদা বানুর বোনের পুরু ঠোঁট দুটির কথা মনে পড়ে। যদিও আক্কাস তার ঠোঁটে কখনও হাত ছোঁয়াতে পারেনি তবুও আক্কাসের রাত কাটে, দিন কাটে কি এক অজানা ঘোরে, সেই ঘোর আক্কাসকে সকাল বিকাল অস্থির করে রাখে। আক্কাস নিজেকে সুস্থির রাখতে দিনাতিপাত করে, রহমতুল্লা মহাজনের আড়তে দিন কাটায়, সন্ধ্যা কাটায়, আলু মাপে, তরকারি মাপে, চালান রেডি করে, তবুও হামিদা বানুর বোনের কথা আক্কাস এক মুহূর্তও এড়াতে পারে না। হাটতে হাটতে আক্কাস যাত্রাবাড়ী থানার সামনে এসে দাড়ায়, থানার সামনে এই রাতদুপুরে এস আই আর ইনফর্মার গুলির আনাগোনা তখনও জমজমাট। এই শালার পুলিশ গুলোকে দেখলেই আক্কাসের তলপেটের চাপ বেড়ে যায়। শহীদ জিয়া স্কুলের কোনায় দাড়িয়ে আক্কাস তার ব্লাডার খালি করে।
” কি বে হউরের পো, বিবির বাগিচায় কি গোয়া মারা দিছিলিনি সুবা সুবা, কামে আইতে দেরী কেলা?” রহমতউল্লা মহাজনের গালি শুনতে শুনতে আক্কাস কাল রাতের বাংলা মালের গুনাগুন বিচার করে আর মহাজনের মা বাপের চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করে কাজে লেগে পড়ে। “মহাজন মাদারচোদ ভি আছে, হালায় ঘরে দুই বউ, মগর হালার সোনার ঝাল মিটে না। কান্দু পট্টির ইংলিশ রোডে হামিদা বানুর কাছে রাইতে একবার না গেলে আর বাংলা মদ গলা তলাক না ঠাপাইলে হালার মন ভরে না” রহমতুল্লাহ মহাজনের চারিত্রিক গুনাগুন বিচার করতে করতে আক্কাস কাজ করে। তবে মহাজন মানুষ ভাল, সন্ধ্যায় আড়তে তালা দেয়ার সময় মহাজন পকেটে একশ টাকার যে নোটটা আক্কাসের পকেটে গুজে দেয় তাতে আক্কাসের দিনের হাত খরচটা আর রাতে যোগির ঘরের খরচটা হয়ে যায়। মহাজন বলে ” টেকা না দিলে তো চুরি করবি, হালার মদতি”। হাসতে হাসতে টাকাটা পকেটে গুঁজে আক্কাস নবাবপুরের অলি গলি পেরিয়ে জয়কালী মন্দিরের সামনে দিয়ে ইত্তেফাককে ডাইনে রেখে সোজা গোপীবাগ রেলগেট বরাবর হাটতে থাকে।
মহাজনের একটি চিঠি নিয়ে আক্কাস যেদিন হামিদা বানুর কাছে যায় সেদিনেই আক্কাস প্রথম হামিদা বানুর বোনের কথা জানতে পারে। ” মহাজন হালায় হামিদা বানুরে রাজরানি কইরা রাখছে”- হামিদা বানুর জলুস দেখে আক্কাসের চোখ চড়ক গাছ। “আইছ, বহ, এক গেলাস সরবত খায়া যাও।” দরজার আড়াল থেকে হামিদা বানুর গলার আওয়াজ আক্কাসকে বাস্তবে নিয়ে আসে। কিন্তু শরবত নিয়ে যে ঘরে প্রবেশ করে তাকে দেখে আক্কাসের হামিদা বানু বলে ভুল করে। সেই ভুল ভাংতে আক্কাসের খুব বেশী দিন লাগেনি, আর যখন ভুল ভাঙল তখন হামিদা বানুর বোন আক্কাসের মাথার সমস্ত ধুলি কনা জবর দখল করে রাজত্ব করছে।
” ওই দিন আক্কাইসসারে দিয়া টেকা পাঠাইলাম, উই টেকা বি দিছিল ঠিক টাইম মতো, লগে একখান চিঠি বি দিছিলাম। রাজাকাররে ঘরে লইছ না, কত বার কইছি, যত টেকা লাগে দিমু, মগর আইজও দেহি ওই খাঙ্কি মাগি যাইয়া রাজাকারের লগে আসনাই চোদায়”, হামিদা বানুর ঘর বন্ধ দেখে মাতাল রহমতুল্লাহ মহাজনের চীৎকার পুরা কান্দু পট্টি গরম করে। আতিউর রাহমান মিজানিকে হামিদা বানুর ঘরে ঢুকতে দেখে মহাজন কাল রাতেও ফিরে গিয়েছিল। মহাজনকে চিনেনা পুরান ঢাকায় এই গলিতে যারা আছে তারা উকি ঝুকি দিয়ে গজগজ করতে করতে জানালা বন্ধ করে এই গরমে। যারা চিনতে পারে তারা এগিয়ে এসে মহাজনকে সরাতে সচেষ্ট হয়। মহাজনের খুলে যাওয়া লুঙ্গি আর তার অন্তর্বাসের ভিতর থেকে উঁকি দেয়া ঝুলন্ত শিশ্ন সবাইকে কিছুটা থমকিয়ে দেয়। তবুও মহাজন বলে কথা। আমেনা-সখিনার ঘরে নিয়ে যখন তাকে শুইয়ে দেয়া হয় তখন মহাজনের গাল বেয়ে বেয়ে মদ আর হলুদ বমির তীব্র গন্ধ এই রাত দুপুরে এই ঘুপছির বাতাসকে এই মহল্লা ছেড়ে পালাতে বাধ্য করে।
সকাল নয়টায় রহমতুল্লাহ মহাজনের ঘুম ভাংলে সে নিজেকে খুজে পায় আমেনা-সখিনার ঘরে। কাজের মেয়েকে দিয়ে চা আর বাকরখানি আনিয়ে আমেনা-সখিনাকে সেলামি দিয়ে মহাজন যখন আড়তে আসে তখন দিন প্রায় মাথার উপর। হামিদা বানুকে একটা চরম সবক দেয়ার প্রত্যাশা নিয়ে মহাজন সারাটা সকাল গুম মেরে থাকে। “হালার এই রাজাকারের বাচ্চারে আমি যদি টিকটিকি দিয়া না চোদাই তয় আমার নাম ভি রহমতুল্লাহ না”। “আক্কাস, ওই আক্কাস, হালায় কামের সময় থাকে কই সব মামদির পো” আক্কাসকে আসতে দেখে মহাজন সুস্থির হয়। “হামিদা বানুর ঘরে যাবি, অরে জিগাবি, কইবি মহাজনে বিলা খাইছে। আর কি কয় হুইনা আইবি”। এই সকালে আক্কাস কখনও ভাবেনি তার হামিদা বানুর ঘরে যেতে হবে। আল্লার কাছে হাজার শোকর, বিসমিল্লাহ বলে আক্কাস হামিদা বানুর উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ে।
এই সাত সকালে এই গলিতে এখনও সূর্যের আলো ঠিকমতো গড়াগড়ি খায়নি, তবুও এখানে আসতে পেরে আক্কাস মহাজনকে ধন্যবাদ জানায়। দরজায় টোকা দিতেই হামিদা বানুর বোন দুয়ার খুলে দাড়ায়। কাল রাতের মহাজনের চীৎকারে যখন ঘুম ভাঙ্গে তখন মধ্য রাত। পাশের ঘরে আতিউর রাহমান মিজানি। সব কিছু ছাপিয়ে এই সাত সকালে আক্কাসকে দেখে হামিদা বানুর বোনের চোখ দুটিতে আলো আধারির লুকোচুরি। ” এই সকালে কি মনে কইরা? ও, মহাজনের লাইগা তদবির করবের আইছ? মহাজনের দিন শেষ, অহন আতিউর রাহমান মিজানিগ দিন”। ” কেলা, দিন শেষ হইব কেলা, মহাজনে টেকা দেয় না? আমাগ মহাজনে আছিল মুক্তিগো কমান্ডার, অর লগে তগ রাজাকারে পারব?” আক্কাসের কথার মধ্যে কিছুটা সন্দেহ আর দোলাচাল। তবে কি হামিদা বানুর বোনের কথাই ঠিক? মহাজনরা কি তবে হেরে যাবে। রাজাকার মিজানিরা কি সত্যিই জিতে যাবে? দেশের বর্তমান অবস্থা আক্কাস যদিও খুব ভাল জানে না তবুও ভাসা ভাসা যা শুনে তাতে রাজাকারদের জয়ের ব্যাপারে তার সন্দেহ হামিদা বানুর বোনকে কিছুতেই বিচলিত করতে পারে না। বরং তাকে খুব বিশ্বাসী মনে হয়। ” মিজানি ভাই কইছে আমাগ গুলশান লইয়া যাইব। মাসাল্লাহ, আরও বড় বড় রাজাকারের লগে আমাগ জান পয়চান করায়া দিবো। শক্ত ডাণ্ডা ওলা রাজাকার। আমরা এই কান্দু পট্টিতে আর থাকুম না, পারব তোমার মহাজন আমাগ এরহম দেখভাল করবের”?
“তুইও যাবি”?
“আমারে রাগবা এমুন মুরোদ লইয়াতো জন্মাও নাইক্কা”, তয় আবর এই কথা জিগাও কেলা”? আক্কাস হামিদা বানুর বোনের চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে, সত্যি কি সব এলোমেলো হয়ে যাবে। এই চোখ আর বুঝি দেখা যাবে না। না, “মহাজনরে বুজায়া, বাজায়া এই রাজাকাররে মাটির নীচে পুইতা ফালাইতে হইব”। চিন্তাটা মাথায় নিয়ে আক্কাস হামিদা বানুর ঘর থেকে বেরিয়ে পড়ে।
আজ সকালটা বড় সুন্দর, জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বৃষ্টিক্লান্ত এই সকালে আক্কাসের ঘুম ভেঙে এই কথাটিই প্রথম মনে হল। সুন্দর সকাল দিয়ে তো আর পেট ভরবে না। মায়ের গজগজানিতে আক্কাস হাত মুখ ধুয়ে বিবির বাগিচা এক নাম্বার গেটে আলমের দোকানে চা-নাস্তা খেয়ে গুলিস্তানগামী টেম্পুতে উঠে পড়ে। গুলিস্তানের নতুন টাকার দোকানগুলোকে ডানে ফেলে আক্কাস যখন মহাজনের আড়তের সামনে এসে দাড়ায় তখনও মহাজনের দোকানের ছাপ খুলেনি। আক্কাসের সন্দেহ হয়। এমন তো হয় না কোনোদিন। মহাজন টাকার ব্যাপারে ষোলআনা। হঠাৎ শুঁটকি মফিজকে কাঁদতে কাঁদতে আসতে দেখে আক্কাসের মন এক অজানা আশঙ্কায় কেপে উঠে। ” কি বে, কান্দছ কেলা, কি অইছে কবিতো”? শুটকির কথায় যা জানা গেল তাতে আক্কাসের শরীরের সব রক্ত লহমায় শুকিয়ে যায়। কাল রাতে কান্দু পট্টিতে ঢুকার সময় কে বা কারা মহাজনকে পিছন থেকে মাথায় বাড়ি দেয় আর এতেই মহাজন মারা যায় সকাল সাড়ে পাঁচটায়। কোন কথা না বলে আক্কাস কান্দু পট্টির দিকে দৌড়াতে শুরু করে। ” কই যাও? মহাজনরে দেখবার যাইবা না”? মফিজের কথায় কর্ণপাত না করে আক্কাস ইংলিশ রোডে ঢুকে পড়ে।
না, নাই, কোথাও কেউ নাই।হামিদা বানুর ঘর, হামিদা বানুর বোনের ঘর সব তন্ন তন্ন খুজে আক্কাস যখন বাইরে এসে দাড়ায় তখন আক্কাস ভীত সন্ত্রস্ত চেহারাগুলোর দিকে তাকিয়ে বুজতে পারে না কি করবে, কোথায় যাবে। মহাজনের লাশের কবর হয়ে যাবে কিন্তু তার আগে হামিদা বানুর বোনকে একবার শেষবারের মতো দেখার আশায় আক্কাস কান্দু পট্টির এ ঘর থেকে ও ঘরে দৌড়াদৌড়ি করে। শেষে পান বিড়ির দোকানের সাত্তারেরে কথায় আক্কাস দিশা পায়। ” তুই আহনের মিনিট দশেক আগে রিকশায় কইরা গুলিস্তান গেছে, অইখান থেইকা গুলশানের বাস ধরব। জলদি লউর দে”। আক্কাস নবাবপুর সড়ক ধরে দৌড়তে শুরু করে।
মানিক নগর, আয়ুব আলীর গ্যারাজ। মহাজন মারা যাবার পর মহাজনের আড়তে আর আক্কাসের জায়গা হয়নি। মহাজনের বড় ছেলে আফাজুল্লাহ হুজুর মানুষ। মহাজনের পারলৌকিক সব কাজ শেষ হবার পর যখন আড়তে প্রথম বারের মতো আফাজুল্লাহ আসে তখনই আক্কাস বুজতে পারে তার দিন এখানে শেষ। ” বুজলা আক্কাস, আমি এই দোকানে কোন পুরানা কর্মচারী রাখুম না। বাপে হালায় সব মদখোর, মাগিখোর গুলিরে আইনা দোকানে ঢুকাইছে। এই ধর পাঁচ হাজার টেকা। যা পার কইরা খাও।” টাকাটা নিয়ে আক্কাস সোজা কালু টোলায় বাহারের রিকশা গ্যারাজে গিয়ে দাড়ায়। আক্কাসের চেহারা দেখে কোন খারাপ কিছুর আশঙ্কায় বাহারের মন কেঁপে উঠে। আক্কাসের সাথে হাটতে হাটতে মওলার গাঞ্জার আঁকড়ায় দুই বন্ধু যখন এসে দাড়ায় তখন আক্কাস বাহারের কথায় দিশা পায়।
“সিএনজি চালাবি”?
“পারুম”?
“সব্বাই পারে, তুই পারবি না কেলা”? তুই কইলে আতর আলীর লগে তরে ভিরাইয়া দেই, মাস খানিক গাড়ি চালান শিখ, উজকে বাদ দেখা যায়ে গা।” বাহার তার স্বভাবসিদ্ধ উরদু ভাষায় আক্কাসের জীবনের সমাধান দিয়ে ফেলে। সেই থেকে শুরু। আতর আলি ওস্তাদ ভাল। এক মাসের মধ্যে গাড়ির অন্দর মহল বাহির মহল সব শিখিয়ে পরিয়ে আক্কাসকে যখন আয়ুব আলীর গ্যারাজে নিয়ে যায় তখন আক্কাস পাকা ড্রাইভার। পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা দেখিয়ে আক্কাস যখন আয়ুব আলীর কাছ থেকে গাড়ি বুঝে নেয় তখন আয়ুব আলীর একটি কথা আক্কাস মনের মধ্যে গেঁথে নেয়।
“মিয়া, নেশা কইরা গাড়ি চালাইয়ো না। যাও, আল্লার হাতে তোমারে সইপা দিলাম”।
না, নেশা করে আক্কাস গাড়ি চালায়নি কোনোদিন। নেশা, হামিদা বানুর বোন সব গাড়ি জমা দেয়ার পর। হামিদা বানুর বোনের সাথে আক্কাসের আর দেখা হয়নি। তো হবে। আক্কাসের মনের এই বিশ্বাস আক্কাসকে স্বপ্ন দেখায় রাতদিন। আক্কাস কে নিয়ে যায় গুলশানের বিভিন্ন বিপণীর সামনে, কখনও আক্কাস গিয়ে দাড়ায় আগরার সিএনজি লাইনে। কাস্টমার তুলতে তুলতে আক্কাস আড়চোখে তাকায় এই ঈশ্বর অধ্যুষিত এলাকার আশীর্বাদপুষ্ট এই সব মানুষগুলোর দিকে। তবে কি হামিদা বানুর বোন আর হামিদা বানুকে রাজাকারে ঈশ্বরের কাছাকাছি নিয়ে গেল। রাজাকারদের চাঁদতারা মার্কা তবে কি ঈশ্বরের মার্কা। কিন্তু আবার আক্কাস যখন এই রাজাকারদের দোসরদের পুলিশের মার খেতে দেখে তখন আক্কাস বুঝতে পারে না কে মহান। নাহ, আক্কাস কোন সমাধান পায় না। আক্কাস খুব দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে সিএঞ্জির গিয়ার বদলায়।
“সংগ্রামী বাংলাদেশ জিহাদি ইসলামী দলের ভাই ও বন্ধুরা। আজ অনেক ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আপনাদের সামনে হাজির হয়েছি। এই দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় জিহাদি ভাইদের ফাঁসিতে ঝুলানোর ষড়যন্ত্র চলছে। আর এই অবস্থায় আমাদেরকে আরও বড় জিহাদি হতে হবে। ঢাকা শহরের প্রতিটি মহল্লায় জিহাদি ইউনিট গঠন করতে হবে। প্রত্যেকের হাতিয়ার আর বোমা সঠিক ভাবে ইস্তেমাল করতে হবে। আমাদের আর পিছনে ফিরে তাকানোর ফুসরত নাই। আপানারা ভয় পাবেন না, আমাদের সাথে আছেন আমাদের পাক-স্থান আরও আছে তাবত জিহাদি ভাই ও বোনেরা। জয় আমাদের হবেই। আর মনে রাখবেন, মরলে শহীদ, জিতলে গাজী, আমরা সবাই মরতে রাজী।” আতিউর রাহমান মিজানির বক্তৃতা উপস্থিত হাজেরানে মজলিসকে উত্তেজিত করে। সমাবেত তাবত সাথী আর কর্মী ভাইদের স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত হয় মিজানির গুলশানের এই ইউনিট। সমাবেত কণ্ঠে আওয়াজ উঠে ” মরলে শহীদ, জিতলে গাজী, আমরা সবাই মরতে রাজী। জিহাদি ভাইদের কিছু হলে জ্বলবে আগুন ঘরে ঘরে, মিজানি ভাই এগিয়ে চলো আমরা আছি তোমার সাথে।” কর্মীদের উত্তেজিত করে বিদায় দিয়ে মিজানি নিজেকে নিয়ে গর্বিত হয়।
“আর কে আছে আমার মতো বুদ্ধিমান রাজাকারের সেবক”? মিজানি নিজেকে প্রশ্ন করে আর উত্তরটা সে নিজেই নিজেকে দিয়ে হামিদা বানুর খোঁজে অন্দর মহলে পা বাড়ায়।
“কি গো হামিদা বানু, আমার গ্লেনফিদিক এর বোতল আর বরফ কই”? নিজের মনে গুন গুন করতে করতে মিজানি হামিদা বানুকে তাগাদা দেয়। হামিদা বানু বোতল নিয়ে মিজানির ঘরে প্রবেশ করে বুঝতে পারে না এই আনন্দের হেতু। মিজানির রহস্যময় হাসি, চোখের শুরমা হামিদা বানুর সামনে মিজানিকে রহস্যময় করে তুলে।
“আরে বহ, কইতাছি”। হামিদা বানু মিজানির কোলের উপর বসে মিজানিকে গ্লাস এগিয়ে দেয়। গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে মিজানি যা বলে তাতে হামিদা বানু মিজানির খুশিতে খুব একটা ভাগ বসাতে পারে না। তবে সুযোগ বুঝে হামিদা বানু বোনের কথা তুলে “কথা দিছিলেন বুইনের লাইগা বড় আর শক্ত ডাণ্ডা ওলা রাজাকার জামাই আইনা দিবেন, কই কিছু তো করলেন না।”
“আর দিমু দিমু, সামনের রবিবার আমাগ আমীর আইব। তারে কইয়া সব মুস্কিল আসান কইরা দিমু।” মিজানির আশ্বাসে হামিদা বানু আশায় বুক বাধে। গ্লেনফিদিক এর সোনা রঙ তরল আগুন মিজানির গলা বেয়ে শরীরের প্রতিটি শিরা উপশিরায় ছড়িয়ে যেতে থাকে। প্রথমে মিজানির দুই হাতকে চেপে ধরে তারপর গলা বুক জ্বালিয়ে ধীরে ধীরে নীচে নামতে থাকে আর নামতে নামতে দুই উরুর মাঝখান বরাবর চেপে ধরে মিজানির শিশ্ন। মিজানি মহান জিহাদি ভাইদের মুক্তির জোশ মনে পয়দা করতে করতে হামিদা বানুর শাড়ি আর তার অন্তর্বাসের ভিতর লুকিয়ে থাকা লোমশ যোনী নিয়ে খেলা করে।
সাপ্তাহিক বন্ধের এই সকালে বাহারকে বিবির বাগিচায় দেখে আক্কাস খুব অবাক হয়। আলমের দোকানে চা আর নাস্তা খেতে খেতে বাহার তাকে আহসান মেহমুদের কথা এবং তাদের আন্দোলনের কথা প্রথম বারের মতো জানায়। “আমাগো লাহান আরও বহুত শ্রমিক, দিনমজুর, গরীব আইব আউজকার মিটিঙে, আমি আইছি তরে লইয়া যাইবের” বাহারের কথা আক্কাসকে ভাবিয়ে তুলে। রহমতুল্লাহ মহাজন মারা যাবার পর আক্কাস ভাবেছে অনেক কিছুই কিন্তু আন্দোলন, সংগ্রাম এই সব আক্কাস কোন দিন তার মাথায় স্থান দেয়নি। মহাজন আর হামিদা বানুর বোনকে নিয়ে দেখা স্বপ্নই তাকে এতদিন ঢাকা শহরের অলিতে গলিতে দাবড়িয়ে বেড়িয়েছে। আজ বাহারের আহ্বান আক্কাসকে ভাবিয়ে তুলে। আক্কাস বাহারের সাথে যখন বাংলাদেশ কম্যুনিস্ট পার্টি অফিসের সামনে বেলা এগারটায় এসে দাড়ায় তখনও চারিদিক থেকে লাল ঝাণ্ডা আর কাস্তে হাতুড়ির মিছিল আসতে শুরু করেনি।
“আমাদের তথাকথিত স্বাধীনতা এসেছিল আজ থেকে প্রায় তেতাল্লিশ বছর আগে, কিন্তু সত্যি কি আমরা স্বাধীন হয়েছিলাম? ১৯৭১-এ আমরা দেখতে পাই রাজাকারদের যারা এই দেশে জন্মেও তাদের প্রাক্তন প্রভুদের লেজুড়বৃত্তি করতে করতে নিজেদের মা, বোন, দেশ সব ওই সব প্রভুদের কাছে বন্ধক দিয়ে এখন সেই দেশে বসে রাজনীতি করছে যেই দেশকে তারা কোন দিন স্বীকার করেনি। ১৯৭১-এর পর আমরা আরেকটি গ্রুপকে দেখতে পাই যারা নিজেদের ক্ষমতার মসনদ পাকা পোক্ত করার জন্য ভারতের তাবেদারি করতে। শুধু যদি তাবেদারিতে সীমাবদ্ধ থাকত তাহলে হয়ত আমাদের কিছুই বলার ছিল না। কিন্তু বন্ধুগন, আজ ২০১৪ তে দাড়িয়ে আমরা কি দেখতে পাই? এই তাবেদার সরকার একে একে আমাদের দেশের সম্পদ ভারতীওদের হাতে শুধু তুলে দিচ্ছে না তাদের এই অপরিনামদর্শী চিন্তা ভাবনা এবং কর্ম আমাদের এই দেশকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিচ্ছে। টিপাইমুখ, ফুলবাড়ি, রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র, কুইক রেন্টাল, শেয়ার বাজার, বিডিআর হত্যাকাণ্ড সব একই সূত্রে গাঁথা।” বিশিষ্ট বাংলাদেশপন্থী আহসান মেহমুদ এর কথা গুলো শুনতে শুনতে আক্কাস এবং বাহার কখন যে তাদের মুষ্টিবদ্ধ হাত তুলে স্লোগানে শরিক হয় দুই বন্ধুর সেই কথা খেয়াল থাকে না। প্রেসক্লাবের সামনে এই গরম পিচের রাস্তার উপর বসে আক্কাস বন্ধুকে অনুকরন করে। “সম্পদের মালিকানা চাই, দিতে হবে, দিতে হবে” “রামপাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করো করতে হবে”। “দুনিয়ার বাঙ্গালী এক হও লড়াই করো” সমাবেত শ্রমিক, রিকশা মজুর, কুলি, সাধারণ জনতা লাল ঝাণ্ডা তুলে গর্জন করে উঠে। তাদের গর্জনে গর্জনে প্রেস ক্লাব এর আঙ্গিনা কেঁপে উঠে, কেঁপে উঠে সচিবালয়ের প্রতিটি ইট আর পাথরের দেয়াল গুলো। আর এতেই মারমুখো হয় পুলিশ। বাংলাদেশের কিছু ভাগ্য তাড়িত মানুষের উপর হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়া সরকারের পুলিশের টিয়ার গ্যাস আর রাবার বুলেট প্রেস ক্লাব এর সামনের রাস্তাকে সাদা ধুয়ায় আচ্ছন্ন করে রাখে। আর এই সাদা ধোঁয়া যখন কিছুটা ফিকে হয়ে আসে তখন সারা প্রেস ক্লাব এর রাস্তা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ছিঁড়া জুতো, ভাঙ্গা চশমা, আহতদের কাতরানি আর আহসান মেহমুদের রক্তাক্ত দেহ সবার নজরে আসে। অধ্যাপক মেহমুদকে যখন ধরাধরি করে প্রেস ক্লাবের ভিতর নিয়ে যায় আক্কাস আর বাহার তখন পুলিশের ডাণ্ডাকে ফাঁকি দিয়ে গুলিস্তান সিনেমা হলের সামনের গোল চক্করের আইলে নিজেদের সঁপে দেয়।
“তুমি আক্কাস না”? হামিদা বানুর বোনের গলার আওয়াজ কান্দু পট্টির পচা গলা মানুষগুলোর গলার আওয়াজকে ছাপিয়ে, নুর হোসেনের মস্তকবিহীন মুষ্টিবদ্ধ হাতকে পাস কাটিয়ে, গুলিস্তানের কামানের উপর বসে থাকা কুদ্দুস পাগলাকে শাহেনশাহ বলে সালাম ঠুকে, গোলাপ শাহ্ মাজারে খাদেমদের হাতে বানান চিলুমে এক টান দিয়ে, গুলিস্তান সিনেমা হলের পিছনে পুরানা কোট প্যান্ট বিক্রি করা আধ খাওয়া, না খাওয়া মানুষগুলোর দীর্ঘশ্বাসকে না চেনার ভান করে আক্কাসের কানের মধ্যে আগুনের মতো প্রবেশ করে। ফার্মগেট এর ফুটব্রিজের নীচে আলুর তরকারি আর রুটি দিয়ে আক্কাস দিনের খাওয়া শেষ করে যখন পানি খেয়ে ঢেঁকুর তুলে ঠিক তখনই হামিদা বানুর বোনের নেকাবে ঢাকা মুখ দেখতে পায়। দেখতে পায় চোখে শুরমা লাগান মিজানির দেহরক্ষীকে। তার ঠাণ্ডা দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে আক্কাস হামিদা বানুর বোনের চোখের দিকে তাকায়। “তুমি বলে সিএনজি চালাও? আমাগো গুলশান দুই নম্বরে নামায়া দিবার পারবা”? আক্কাস পাশেই দাড়িয়ে থাকা সিএনজির দরজা খুলে গাড়িতে স্টার্ট দেয়।
আক্কাসের গাড়ি এগিয়ে চলে। বহুদিন পর ঢাকা শহরের এই ভি আই পি রাস্তাগুলোকে আক্কাসের খুব আপন মনে হয়। রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাড়িয়ে থাকা ট্রাফিক পুলিশের ইশারা, সন্ধ্যার সময় দরজা ধরে দাড়িয়ে থাকা কান্দু পট্টির খানকিগুলোর লাল লিপস্টিক দেয়া ঠোঁট এর ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে আসা ক্রিত্তিম ভালবাসার আহবান, সব কিছুই আজ আক্কাসের ভাললাগার সাথে একাত্ম হয়ে যায় এই ঈশ্বরের মহল্লায়। ভাল লাগে এই গরম হাওয়া, ধুলো বালি আর ঢাকা শহরে বেড়ে ওঠা হাজারও দালান কোঠা। আজ আক্কাস অনেক কিছুই পারে। আজ আক্কাস ঢাকা শহরের যোগীর ঘরে সব বাংলা খেয়ে শেষ করতে পারে, পারে ঢাকার অলিতে গলিতে ছড়িয়ে থাকা হাজারও উলঙ্গ মিজানিদের বুকে লেপটে থাকা হামিদা বানুদের ছিনিয়ে নিতে।
“আমাগো এইহানে নামায়া দাও”। হামিদা বানুর বোনের কথায় আক্কাস বাস্তবে ফিরে আসে। হামিদা বানুর বোনের গলার আওয়াজ আক্কাসের সমস্ত ভালোলাগার গায়ে পানি ঢেলে দেয়। তবে কি আবারো সে হারিয়ে যাবে। আবার কি এই ঢাকা শহরের রাস্তায় রাস্তায় তাকে খুজতে খুজতে বাকি জীবনটা পার করতে হবে? গুলশানের দুই নাম্বারে একটি বিপণীর সামনে আক্কাস যখন হামিদা বানুর বোনকে নামিয়ে দেয় তখন হামিদা বানুর বোন আক্কাসকে তার বাড়ির ঠিকানা দিতে ভুল করে না। কিন্তু আক্কাসের কাছে এই ঠিকানা প্রথম বারের মতো খুব মূল্যহীন মনে হয়। আজ প্রথম বারের মতো আক্কাস বুঝতে পারে তার আর হামিদা বানুর বোনের মধ্যে সীমাহীন দুরত্তের কথা। আর বুঝি রাজাকারের কাছ থেকে হামিদা বানুর বোনকে ছিনিয়ে নেয়া যাবে না। হামিদা বানুর বোন বুঝি আর আক্কাসের হল না। হামিদা বানুর বোনকে মিজানিরা অনেক উপরের তলায় নিয়ে গেছে। সেই উপরের তলার মানুষগুলো ঠিক ঠিক মানুষ কিনা আক্কাস তা অনেক চেষ্টা করেও স্থির করতে পারে না। হতে পারে তারা ঈশ্বরের প্রতিনিধি, আর এই ঈশ্বরের খাস বান্দাদের সাথে আক্কাসের মতো আম মানুষ কি পারবে? কিছু একটা করতে হবে। কিন্তু কি করবে আক্কাস বুঝে উঠতে পারে না। তবে কি মিজানিরা এই দেশের তাবত মুক্তি সংগ্রামীকে মহাজনের মতো হত্যা করবে? আর তারপর তাদেরই ঘরের মানুষকে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে আর আক্কাসরা এই দুঃখ বুকে নিয়ে ঢাকা শহরের রাস্তায় ঘুরে মরবে? মহাজনের মতো মুক্তি কমান্ডার পারেনি, আক্কাস, বাহার কিম্বা আহসান মেহমুদরা কি পারবে এই উপরের তলার মানুষের কাছ থেকে হামিদা বানুর বোনদের ছিনিয়ে নিতে, পারবে কি তাদের সম্পত্তির অধিকার ফিরিয়ে দিতে, পারবে কি তাদের আসমান থেকে মাটিতে নামিয়ে আনতে? প্রশ্নগুলো খুব সাধারণ মনে হয় না আক্কাসের। এই সব প্রশ্নের উত্তর কোথায় পাওয়া যাবে তা পুরান ঢাকার রহমতুল্লাহ মহাজনের গেটিস সিএনজি ড্রাইভার আক্কাসের মাথায় আসে না। তবুও আক্কাস বেঁচে থাকে, গাড়ি হাঁকায়, কাস্টমার তুলে, বাহারের সাথে গোপীবাগে যোগীর ঘরে যায়, হামিদা বানুর বোনের কথা ভাবতে ভাবতে গাঁজা কল্কিতে সাঁজায়, যোগীর বউয়ের নাভির কথা ভাবতে ভাবতে হস্ত মৈথুন করে আর রাজাকারকে কি ভাবে মাটির নীচে পুতে ফেলা যায় তাই ভাবতে ভাবতে একেকটি দিন পার করে।
“থাকস কই তুই, আতর আলিরে দিয়া তিনবার খবর পাঠাইলাম, কয় নাইক্কা তোরে”? বাহারের সাথে গত প্রায় সাতদিন দেখা নাই। ভোর সাতটায় বাহার যখন আক্কাসকে ঘুম থেকে ঠেলে উঠায় আক্কাস তখন সবে হামিদা বানুর বোনকে জড়িয়ে ধরে পাস ফিরে শুয়েছে। বাহারের গলার আওয়াজ আক্কাসকে হামিদা বানুর বোনের বুক থেকে জোর করে সরিয়ে দেয়। “আবে ওঠ, বহুত কাম আছে”। বাহারের তাগাদায় আক্কাস আড়মোড়া ভাঙ্গে। আলমের দোকানে চা খেতে খেতে বাহার জানায় রামপালে লং মার্চ এর কথা। কাল সকালে যাত্রা শুরু। বাহার জানতে চায় আক্কাসের মত। ” তুই কইলে হালায় দোজকেও যামু, আর এইটা তো মেহমুদ ভাইয়ের ডাক দেশের লাইগা, যামু না কেলা”? বন্ধুকে আক্কাস আশ্বস্ত করে। কাল সকাল ছয়টায় রওনা হবার বন্দোবস্ত করতে বাহার কালুটোলার উদ্দেশে যাত্রা করে। “বহুত কাম বাকি, কাইল কলাম দেরি করিস না” কথা দুটো বলে বাহার হারিয়ে যায় যাত্রাবাড়ীর হাজারও মানুষের ভিড়ে। আক্কাসের হয়েছে জ্বালা, হামিদা বানুর বোন, আয়ুব আলীর গ্যারাজ, এত সব ফেলে যাওয়া কি সহজ কথা। না, কাজটা মোটেই সহজ না। তবুও আক্কাস যাবে। এই যাত্রায় আক্কাস বাহারকে সব খুলে বলার সিদ্ধান্ত নেয়। “রাজাকারের মায়রে বাপ, এইবার শেষ খেলা খেলুম ওই রাজাকারের বাচ্চার লগে”। আক্কাস জমানো টাকার থেকে কিছু টাকা পকেটে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে নিতিনের কামারের দোকানের উদ্দেশে। “ভাল দাইখা এউগা কাতা বানায়া দাও নিতিনদা। সাদা চক চক করন চাই।” নিতিনের দোকানে দুশো টাকা রেখে আক্কাস সিটি পল্লীর পিছন দিয়ে আয়ুব আলীর গ্যারাজ বরাবর হাটতে শুরু করে।
রামপাল থেকে ফিরে আক্কাস এক নতুন মানুষ। কত বড় বড় মানুষের সাথে রাত দিন একই আকাশের নীচে, কত গল্প, স্বাধীনতার গল্প, সত্যিকারের স্বাধীনতা, যেখানে মানুষ মানুষের অধিকারের কথা বলে, যেখানে নেই কোন শ্রেণী ভেদ, বৈষম্য। যেখানে সম্পদের মালিকানার আর সুষম বণ্টনের কথা আক্কাস প্রথম বারের মতো জানতে পারে, জানতে পারে এই পৃথিবীর এক ভাগ মানুষের কথা যারা ক্ষমতার শীর্ষে চড়ে বাকি নিরানব্বই ভাগ মানুষকে শোষণ করছে। জানতে পারে আমাদের দেশের সেই সব মানুষের কথা যারা শেয়ার বাজারে ডাকাতি করেছে দিনে দুপুরে আর পঙ্গু করে দিয়েছে তেত্রিশ লক্ষ নিন্ম মধ্যবিত্ত বাঙ্গালীর জীবন। জানতে পারে কি ভাবে এই দেশের ভুসম্পদ একে একে বিদেশীদের হাতে বাক্তিগত কমিশনের মাধ্যমে তুলে দেয়া হচ্ছে। কিভাবে বিডিআর হত্যাকাণ্ডের মধ্যে দিয়ে দেশের স্বাধীনতাকে বিপন্ন করা হয়েছে। জানতে পারে কোন নীল নকশার মাধ্যমে রাজাকারদের মুক্তিযোদ্ধা বানান হচ্ছে। আর তখনই আক্কাস রহমতুল্লাহ মহাজনের মৃত্যুর চূড়ান্ত প্রতিশোধ নেয়ার শপথ নেয়।
বাহারকে আক্কাস সব যখন খুলে বলে তখন বাহারও আক্কাসের সাথে এক মত হয়। নিতিনের কাছ থেকে কাতাটা নিয়ে আক্কাস রাত দিন নিজের সাথে নিজে কথা বলে, মিজানির মাথা নিয়ে ফুটবল খেলার তীব্র বাসনা আক্কাসকে রাত দিন পোড়ায়। কাতাটাকে কাগজে মুড়ে আক্কাস সিএনজির সিটের নীচে রেখে দেয় আর গুলশানের মিজানির ইউনিট-এর সামনে রাতদিন পাহারায় থাকে।
আজ শুক্রবার। জুম্মা বার, মিজানিকে ঘর থেকে বের হতে দেখে আক্কাস নিজেকে প্রস্তুত করে। কাতাটা টান দিয়ে সিটের নীচ থেকে বের করে নিয়ে আক্কাস মিজানির উদ্দেশে হুংকার দিয়ে উঠে। “মিজানি খানকির পোলা, রাজাকারের বাচ্চা, তোরে খাইছি” চীৎকার দিয়ে আক্কাস ঝাঁপিয়ে পড়ে মিজানির উপর। কিন্তু এত রক্ত কথা থেকে এলো আক্কাসের শরীরে? আক্কাসের নাক,কান, মুখ বেয়ে ফারাক্কার খোলা বাঁধের মতো লাল রক্তের ফোয়ারা আক্কাসকে আচানক খুব ক্লান্ত করে তুলে। মিজানির দেহরক্ষীর গুলি আক্কাসের বুকে বাংলাদেশের একটি লাল মানচিত্র একে দিয়ে যখন বেরিয়ে যায় ঠিক তখনই আক্কাস মহাজনকে দেখতে পায়। কাঁধে এল এম জি, “মহাজন হালায় এত জোয়ান হইল কবে? লুঙ্গি কোচ মারা, পায়ে আর্মিগো লাহান বুট, মাথায় আবর লোহার গোল ঢাকনা বি আছে। লেকিন, মহাজন যায় কই? মহাজন আবর কান্দু পট্টির দিকে যাইব নিকি, নাকি বুড়িগঙ্গার অইপারে মহাজনে পাকিগো কাম্পে হামলা করবার যাইব। মর জ্বালা, মহাজনের হুজ্জতি অহনও গেল না। আউজকা হালায় কত কাম, বাহারের লগে মেহমুদ ভাইয়ের মিছিলে যাইতে হইব, দুনিয়ার মজদুর এক হও লড়াই কর, এক হও লড়াই কর”, সম্পদের মালিকানা দিতে হবে দিতে হবে, রামপাল, টিপাই মুক বন্ধ কর, করতে হবে”। “নাকি হালায় মহাজন সব ঠিক ঠাক কইরা ফালাইছে, হামিদা বানু আর হামিদা বানুর বইনে কান্দু পট্টির গল্লিতে আক্কাস আর মহাজনের লাইগা সরবত বানাইয়া ইন্তেজার করতাছে”? মহাজনের ইশারায় আক্কাস মহাজনের পিছু নেয়। হাটতে হাটতে মহাজন ঢাকা মেডিকেলের সামনে দিয়ে শহীদ মিনারের সামনে এসে দাড়ায়। তার হাতের ইশারায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাস্তাগুলি ধীরে ধীরে দুই ভাগ হয়ে যেতে থাকে, তার ভিতর থেকে উঠে আসা সাদা কাফন পরা সার্জেন্ট জহুরুল, হুমায়ুন আজাদ, নুর হোসেন, বাশুনিয়া, দিপালি সাহা, রফিক, জব্বার, সালামকে চিনতে আক্কাসের কষ্ট হয় না। সাদা কাফন গুলো সরিয়ে সবাই যার যার হাতিয়ার গুলো পরিষ্কার করতে করতে মহাজনের পিছনে এসে লাইন দিয়ে দাড়ায়। আক্কাসও তার চক চকে কাতাটা কাঁধের উপর ফেলে লাইনে শরিক হয়।
আপনার মতামত লিখুন :