

মধুপুর টাঙ্গাইলের আদি অধিবাসী গারোদের উচ্ছেদের লক্ষ্যে সশস্ত্র হামলা করা হয়েছে। বাণিজ্যিক স্বার্থে সেখানে রাবার বাগান সম্প্রসারণ করা হবে। মাইক ও মিডিয়ার সামনে স্থানীয় এসপি, এমনকি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী যদিও এটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলবেন, কিন্তু আদতে এটা- দীর্ঘদিনের জাতিগত নিপীড়নেরই এক ধারাবাহিকতা। এর অংশ হিসেবেই আজ সংশ্লিষ্ট বাগানের এমডি আমান উল্লাহ আমান গং একদল সশস্ত্র ব্যক্তিকে নিয়ে গারোদের ওপর চড়াও হয়েছে।
এসব কথাবার্তাকে নিছক আবেগীয় উচ্চারণ না ভেবে, দেখেন কীভাবে ও কতভাবে গারোদের ওপরে শাস্তিযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ সংঘটিত হয়েছে:
(১) মাত্র ১৯ সেকেন্ডের ভিডিওতে দেখা গেছে, সশস্ত্র ব্যক্তিরা অন্তত তিনবার নিরস্ত্র গারো নারী ও শিশুর ওপর সরাসরি গুলি করতে উদ্যত হয়েছে। গুলিভর্তি বন্দুকে ট্রিগার ক্লিকের শব্দ স্পষ্ট শোনা গেছে।
বাংলাদেশের পেনাল কোড বা দণ্ডবিধি অনুযায়ী, কাউকে লক্ষ্য করে আগ্নেয়াস্ত্র প্রদর্শন বা প্রাণের ভয় দেখানো ‘অ্যাসাল্ট’ এবং ‘অ্যাটেম্পট টু মার্ডার’-এর শামিল।
অস্ত্রধারী ব্যক্তিরা যদি সরকারি বাহিনীর সদস্যও হয়ে থাকে, তবে আত্মরক্ষা বা চরম বিশৃঙ্খলা ছাড়া সাধারণ নাগরিকের দিকে বন্দুক তাক করা সরাসরি মানবাধিকারের লঙ্ঘন এবং চেইন অফ কমান্ডের বিচ্যুতি।
(২) হামলাকারীদের পোশাক ও আচরণ তাদের সরকারি বা বাহিনী-পরিচয়কে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তাদের ইউনিফর্মে স্পষ্টতই কোনো ‘নেম প্লেট’ ছিল না।
বাংলাদেশ সার্ভিস রুলস এবং আনসার বাহিনীর প্রবিধানমালা অনুযায়ী, ডিউটিরত অবস্থায় নেম প্লেট ছাড়া পোশাক পরা গুরুতর শৃঙ্খলাভঙ্গ।
পরিচয় গোপন রেখে এই সশস্ত্র উপস্থিতি প্রমাণ করে যে, তারা কোনো আইনি দায়িত্ব পালন করতে আসেনি, বরং ভাড়াটে গুণ্ডাবাহিনীর মতো ত্রাস সৃষ্টি করতে এসেছে।
আইনের ভাষায় এটি ‘ইমপার্সোনেশন’ বা ছদ্মবেশ ধারণ করে অপরাধ সংঘটনের নামান্তর।
(৩) বাংলাদেশের সংবিধানের ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইনের আশ্রয় লাভ এবং আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও স্বাধীনতার অধিকার থেকে কাউকে বঞ্চিত করা যাবে না।
অর্থাৎ, কোনো উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনার আগে অবশ্যই লিখিত নোটিশ এবং উচ্চ আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা থাকা বাধ্যতামূলক।
কোনো ধরণের পূর্ব নোটিশ বা আগাম ঘোষণা ছাড়া কোনো নাগরিকের ঘরবাড়িতে হামলা বা উচ্ছেদচেষ্টা সরাসরি ‘ফোর্সেবল ডিসপোজেশন’, যা দেওয়ানি ও ফৌজদারি উভয় আইনে দণ্ডনীয় অপরাধ।
(৪) ঐতিহাসিকভাবে স্থানীয় গারো জনগোষ্ঠী এই ভূমির আদি মালিক। রাষ্ট্র কখনো কখনো তাদের বনখেকো বা দখ*লদার হিসেবে চিহ্নিত করার যে (অপ)চেষ্টা করে, তা ঐতিহাসিক সত্যের পরিপন্থী।
১৯৫০ সালের ‘স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি অ্যাক্ট’-এর ৯৭ ধারা অনুযায়ী, ‘আদিবাসীদের’ ভূমি সুরক্ষা ও হস্তান্তরের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট আইনি বিধান আছে।
রাবার বাগান সম্প্রসারণের নামে বাণিজ্যিক স্বার্থে তাদের উচ্ছেদ করা সেটা একইসাথে বেআইনি, এবং তাদের ‘রাইট টু শেল্টার’ বা বাসস্থানের মৌলিক অধিকারের ওপর এক নগ্ন হস্তক্ষেপ।
(৫) বাংলাদেশ আইএলও কনভেনশন-১০৭ (ILO Convention 107)-এ স্বাক্ষরকারী একটি রাষ্ট্র। এই আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী, রাষ্ট্র ‘আদিবাসীদের’ প্রথাগত ভূমির অধিকার রক্ষা করতে এবং তাদের সম্মতি ছাড়া উচ্ছেদ না করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
মধুপুরের বন ও ভূমি গারোদের অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে। তাদের মতামত ছাড়া এই সশস্ত্র হামলা দেশের আইন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার- উভয়কেই বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো, যা বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করছে।
(৬) ১৯২৭ সালের বন আইন এবং এর পরবর্তী সংশোধনীগুলোতেও বনের ওপর নির্ভরশীল নৃগোষ্ঠীর ‘নির্ধারিত অধিকার’ কেড়ে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
ইকোপার্ক বা রাবার বাগান- নাম যাইহোক না কেন, উন্নয়নের আড়ালে মূলত ‘আদিবাসীদের’ উচ্ছেদ করে মুনাফা লোটার আয়োজন চলছে।
পরিবেশ রক্ষার দোহাই দিয়ে বনের আদি সন্তানদের ওপর বন্দুক তাক করা এক নিষ্ঠুর রসিকতা। কারণ, এই বনকে যুগ যুগ ধরে সন্তানের মতো আগলে রেখেছে গারোরাই, আমান উল্লাহ আমানদের মতো মোটা মায়নার চাকরিজীবী বনখেকোরা নয়।
(৭) বাংলাদেশের মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের একাধিক রায়ে বলা হয়েছে যে, কোনো ব্যক্তিকে তার ঘরবাড়ি থেকে যথাযথ পুনর্বাসন বা পর্যাপ্ত আইনি নোটিশ ছাড়া জোরপূর্বক উচ্ছেদ করা যাবে না।
১৯ সেকেন্ডের ঐ ভিডিওতে দেখা যাওয়া বন্দুকের নল প্রমাণ করে যে, সেখানে আইন প্রয়োগ করা হয়নি, বরং আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতি কায়েম করা হয়েছে।
একজন নাগরিকের জানমাল রক্ষার দায়িত্ব যেখানে রাষ্ট্রের, সেখানে রাষ্ট্রযন্ত্রের অংশ পরিচয় দিয়ে (নেমপ্লেট বিহীন আনসার) জনগণের ওপর চড়াও হওয়া একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে অরাজকতার চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।
অবশ্য, এতসব মানবিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক আইনি সুরক্ষা সত্ত্বেও শেষতক দেখা যাবে এ ঘটনায় Railroad আমানুল্লাহ আমান কিংবা নেমপ্লেটবিহীন সশস্ত্র সন্ত্রাসী ওরফে পরিচয়হীন আনসারদের কিছুই হবে না। কারণ, এর চেয়েও গুরুতর অপরাধ করে, এমনকি পীরেন স্নালের মতো তরতাজা গারো যুবককে গুলি করে হত্যারই কোনো বিচার হয়নি।
বিচারহীনতার সেই সংস্কৃতিই সন্ত্রাস পরিবৃত্ত আমান গংদের আস্কারা দিয়েছে। হতে পারে এই অসভ্য মানবেতর রাষ্ট্রই এটাই চেয়ে এসেছে বরাবর- উনয়নের নামে একেকটি জনগোষ্ঠীকে জাতিগতভাবে নির্মূল করার কৌশল বাস্তবায়ন।
তবে, গারোরা যদি এই নিয়তি মেনে নিতে না চান, তাহলে আজ তাদেরকে আরেকবার বুক টান টান করে মুখোমুখি হতে হবে- শহীদ পীরেন স্নাল, শহীদ আলফ্রেড সরেন কিংবা শহীদ জনি হাসদার সংগ্রামী স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে, নিজেদের ন্যায্য অধিকারের দাবিতে।
চারু হকচারু হক
লেখক ও বিশ্লেষক।






































আপনার মতামত লিখুন :