ছায়ানটের প্রতি একটি অংশের ছাত্র–জনতার বিরূপ মনোভাব
নিউজ ডেক্স
প্রকাশের সময় : ডিসেম্বর ২১, ২০২৫, ৮:০৩ অপরাহ্ন
মহিন আরহাম, এক্সেকিউটিভে এডিটর-
ছায়ানটের প্রতি একটি অংশের ছাত্র–জনতার বিরূপ মনোভাব তৈরি হওয়ার পেছনে একাধিক সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কারণ কাজ করেছে। বিষয়টি একরৈখিক নয় বরং সময়, প্রেক্ষাপট ও ঘটনাভেদে এই মনোভাবের তীব্রতা বদলেছে। সংক্ষেপে কিন্তু বিশদভাবে কারণগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
১. রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বিতর্ক
ছায়ানটকে অনেকেই মনে করেন একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও বাম–উদার (secular-liberal) ধারার ঘনিষ্ঠ সাংস্কৃতিক সংগঠন।
- ছাত্রসমাজের একটি অংশ অভিযোগ করে যে ছায়ানট রাষ্ট্র বা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর সমালোচনায় সবসময় সমানভাবে সোচ্চার নয়
- আবার সরকারবিরোধী সময়ে ছায়ানটকে নীরব বা সতর্ক থাকতে দেখা গেছে—যা “সিলেকটিভ প্রতিবাদ” হিসেবে ধরা হয়
ফলে রাজনৈতিকভাবে সচেতন শিক্ষার্থীদের মধ্যে আস্থার ঘাটতি তৈরি হয়।
২. ধর্মীয় অনুভূতি ও সাংস্কৃতিক উপস্থাপন
ছায়ানট মূলত রবীন্দ্রসংগীত ও শুদ্ধ বাঙালি সংস্কৃতির ধারক—এটাই তাদের শক্তি, আবার এটিই বিতর্কের জায়গা।
- কিছু ছাত্র ও তরুণ মনে করেন,
- ছায়ানট ধর্মীয় সংস্কৃতি বা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অনুভূতিকে পর্যাপ্তভাবে প্রতিনিধিত্ব করে না
- বিশেষ করে ইসলামি সংস্কৃতি বা আধুনিক তরুণদের সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি সেখানে কম জায়গা পায়
এতে করে ছায়ানটকে “এলিট” বা “একপেশে সংস্কৃতি চর্চার সংগঠন” বলে আখ্যা দেওয়া হয়।
৩. তরুণদের সাথে সংযোগের ঘাটতি
বর্তমান প্রজন্মের ছাত্ররা:
- ডিজিটাল, বহুমাত্রিক ও বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত
- প্রতিবাদ, শিল্প ও সংস্কৃতিতে তাৎক্ষণিক ও সাহসী অবস্থান প্রত্যাশা করে
ছায়ানটকে অনেকের চোখে মনে হয়:
- অতিরিক্ত প্রথাগত ও রক্ষণশীল
- সমসাময়িক ছাত্র আন্দোলন, ক্যাম্পাস রাজনীতি বা তরুণদের সংকট নিয়ে কম সরাসরি সম্পৃক্ত
ফলে “আমাদের কথা তারা বলে না”—এমন ধারণা তৈরি হয়।
৪. গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে বয়ান
- সামাজিক মাধ্যমে ছায়ানটকে নিয়ে আংশিক তথ্য, পুরনো ঘটনা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ব্যাখ্যা ছড়ানো হয়
- কিছু ইউটিউব/ফেসবুক পেজ ছায়ানটকে
- “রাষ্ট্রঘনিষ্ঠ”
- “ধর্মবিরোধী”
- বা “নির্দিষ্ট আদর্শের সাংস্কৃতিক হাতিয়ার”
হিসেবে উপস্থাপন করে
অনেক ছাত্র এসব বয়ান গ্রহণ করে ফেলে।
৫. প্রত্যাশা বনাম বাস্তবতা
ছায়ানটের ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবময়—বিশেষ করে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ভূমিকা।
- সেই ঐতিহাসিক ভূমিকার কারণে ছাত্রসমাজ আজও তাদের কাছে নৈতিক নেতৃত্ব প্রত্যাশা করে
- কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় ছায়ানট সেই প্রত্যাশা পূরণ করছে না—এমন ধারণা থেকেই হতাশা ও বিরূপতা জন্ম নেয়
উপসংহার
ছায়ানটের প্রতি বিরূপ মনোভাব মূলত:
- রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ
- ধর্ম ও সংস্কৃতির প্রতিনিধিত্ব প্রশ্ন
- তরুণদের সাথে দূরত্ব
- এবং সামাজিক মাধ্যমের বয়ান
এই সবকিছুর সম্মিলিত ফল।
তবে মনে রাখা জরুরি, ছায়ানট এখনও বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। বিরূপতা যেমন আছে, তেমনি এখনো অনেক ছাত্র–তরুণ তাদের শ্রদ্ধা ও গুরুত্ব দেন।
ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন:
আপনার মতামত লিখুন :