বাংলাদেশে: মন্ত্রীর ‘ধমক’ ও কগনিটিভ বায়াস


অনলাইন ডেক্স প্রকাশের সময় : জানুয়ারী ৩০, ২০২১, ৬:২৯ পূর্বাহ্ন
বাংলাদেশে: মন্ত্রীর ‘ধমক’ ও কগনিটিভ বায়াস

পুরো পৃথিবীর বিজ্ঞানীরা যা কয়েক মাস ধরে বলছেন, নতুন করে সে কথা বলার জন্য ধমক খেলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক৷ বক্তব্য প্রত্যাহার করে দোষ চাপালেন স্ক্রিপ্ট লেখকের ওপর৷ তিন মাস আগে ‘আমরা করোনার চেয়ে শক্তিশালী’ কে যেনো বলেছিল?
করোনা ভাইরাস ঠেকাতে শুরু থেকে বাংলাদেশে যে হাস্যরস, উলটাপালটা মন্তব্য, অব্যবস্থাপনা, অকার্যকর সিদ্ধান্ত ইত্যাদি চলছে, ভাইরাস চিন্তা করতে পারলে খুব কনফিউজড হয়ে যাওয়ার কথা৷
এমন পরিস্থিতিতে যখন সংক্রমণ দ্রুত বাড়ছে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ব্রিফিংয়ে বললেন, ‘‘এটি দুই থেকে তিন বছর বা তার চেয়েও বেশি দিন স্থায়ী হবে৷ যদিও সংক্রমণের মাত্রা উচ্চ হারে নাও থাকতে পারে৷” এটা নতুন কোনো কথা নয়৷ গত কয়েক মাস ধরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিজ্ঞানীরা এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও একই কথা বলে আসছে৷ যদি সামনের বছর ভ্যাকসিন চলেও আসে, সেটির অনুমোদন, উৎপাদন, ও সবশেষে বিশ্বের ৭০০ কোটিরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছানো চাট্টিখানি কথা নয়৷ করোনা ভাইরাস নিজে আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত না নিলে অনায়াসে দুই বছর লেগে যাওয়ার কথা৷
কিন্তু তবুও বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমও সেটা খুব ফলাও করে প্রচার করলো৷ ফলশ্রুতিতে পরদিন নিজের বাসায় ব্রিফিংয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সরকারের সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের এই মন্তব্যকে ‘দায়িত্বজ্ঞানহীন’ বলে বেশ ধমকের সুরেই কথা বললেন৷ তিনি বললেন, ‘‘সরকার যখন দিনরাত পরিশ্রম করে মানুষের মনোবল চাঙা রাখার নিরলস প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখন স্বাস্থ্যবিভাগের কোনো কোনো কর্মকর্তার করোনার আয়ুষ্কাল নিয়ে অদূরদর্শী ও দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্য জনমনে হতাশা তৈরি করেছে৷’’
মানুষের মনোবল চাঙ্গা রাখার জন্যই হয়তো ওবায়দুল কাদের ২১ মার্চ বলেছিলেন, ‘‘করোনা এমন কোনো শত্রু শক্তি নয়, যে তাকে পরাজিত করা যাবে না, আমরা করোনার চেয়ে শক্তিশালী৷ জাতি হিসেবেও আমরা শক্তিশালী৷ ভয়কে জয় করতে হবে৷” তার এমন কথায় ভয়কে জয় করার জন্য মানুষ সরকারের আর কোনো নির্দেশ না মেনে ছুটির মধ্যে বাড়ি গেলো, ঘুরতে থাকলো৷ আমরা এরপর আর তার মুখ থেকে জানতে পারলাম না ‘ভয়কে জয়’ করতে গিয়ে মানুষকে কেন রাস্তায় পুলিশের লাঠির বাড়ি খেতে হলো৷
এদিকে বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিনে শোক প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘‘বিশ্বের যে যতই শক্তিধর হোক, যতই অর্থশালী হোক, অস্ত্রে শক্তিশালী হোক; কোনো শক্তিই কাজে লাগছে না করোনা ভাইরাসের কাছে৷ মনে হচ্ছে করোনা ভাইরাসটাই সবচেয়ে শক্তিশালী৷’’ নিশ্চয়ই তিন মাস আগের মন্তব্যের জন্য ওবায়দুল কাদেরও ধমকটা পেয়ে গেছেন৷
তবে মানুষের মনোবল চাঙ্গা রাখার মন্তব্যটা নিয়ে আমি সম্পূর্ণ একমত৷ এক্ষেত্রে সরকারও যেমন ব্যর্থ হচ্ছে সুস্পষ্ট বক্তব্য দিতে, আমরা জনগণও খুঁজে খুঁজে হতাশা বের করছি, সংবাদকর্মীরাও জনগণের ভয়-হতাশাকে কাজে লাগিয়ে কাটতি বাড়াতে ‘হায় হায়, সব গেল বুঝি’ টাইপের সংবাদই বেশি পরিবেশন করছি৷
একটি গ্লাসে অর্ধেক জল ভরা৷ এখন সেটাকে অর্ধেক ভর্তি, নাকি অর্ধেক খালি হিসেবে দেখবেন তা পুরোটাই নির্ভর করে যে দেখছে তার মানসিকতার ওপর৷ এই ‘কগনিটিভ বায়াস’ নিয়ে মনোস্তত্ত্ববিদদের বিশাল বিশাল গবেষণাও রয়েছে৷
আমরা এখন ইন্টারনেটের কল্যাণে পৃথিবীর সবশেষ তথ্য আমাদের হাতের নাগালে পাচ্ছি৷ ফলে নিজেরাই ওয়ার্ল্ডোমিটারে সার্চ দিয়ে দেখছি বাংলাদেশ কত নাম্বারে পৌঁছে গেছে৷ সেখানে শুরুতেই সংক্রমণের মোট সংখ্যার ভিত্তিতে ২১৫টি দেশ ও অঞ্চলের তালিকা দেয়া আছে৷ বাংলাদেশ ১৭ নাম্বারে অবস্থান করে বেশ খারাপই আছে বলে আমরা ধরে নিচ্ছি৷ আমরা চীনকেও ছাড়িয়ে গিয়েছি৷
গ্লাস যদি অর্ধেক খালি হয় তাহলে আমরা আরো দেখতে পাবো মোট মৃত্যুর তালিকায় বাংলাদেশ ৩০ নম্বরে, অ্যাকটিভ কেসে ৭ নাম্বারে থাকলেও প্রতি ১০ লাখ মানুষে টেস্টে রয়েছে ১৪৭ নাম্বারে৷
এবার গ্লাসটাকে অর্ধেক ভরা দেখুন৷ প্রথমত করোনার সংক্রমণ হিসেব করাটা একটা ফাঁকি৷ বাংলাদেশের অধিকাংশ জনগণ মনে করেন চীন তথ্য গোপন করে, অথচ তারা বিশ্বাস করেন বাংলাদেশ সংক্রমণের সংখ্যায় চীনকে ছাড়িয়ে গেছে৷ যদি চীনের দেয়া সংক্রমণ বিষয়ক তথ্য শতভাগ সত্যিও হয়, বিজ্ঞানীরা বলছেন বিশ্বের আসল সংক্রমণ আরো কয়েক লাখ বেশি হবে, কারণ বেশিরভাগের কোনো লক্ষণই প্রকাশ পায়নি৷ তাহলে কিসের ভিত্তিতে আমরা এই তালিকা ফলো করছি? যা জানা গেছে সেটার ভিত্তিতে তাই তো?
নিউজিল্যান্ড থেকে শুরু করে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আমরা বাংলাদেশের তুলনা করছি৷ আমরা কি এটা খেয়াল করছি যে পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৫ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকায় জনসংখ্যা ৪৫ কোটি, যেখানে বাংলাদেশে কেবল দেড় লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকায় মানুষ প্রায় ২০ কোটি? আমরা কি জানি বাংলাদেশের দ্বিগুণ আকারের দেশ নিউজিল্যান্ডে মানুষ মাত্র ৪০ লাখ? ফলে সেসব দেশে স্বাভাবিক অবস্থাতে যে সামাজিক দূরত্ব বজায় থাকে, বাংলাদেশে ঘোষণা দিয়েও তা সম্ভব না হওয়াই স্বাভাবিক নয় কি?

ব্রাজিলের পরিস্থিতি আমরা সবাই জানি৷ দেশটির সরকার করোনাকে পাত্তাই দেয়নি৷ ফলে এখন সেটি হটস্পটে পরিণত হয়েছে৷ কিন্তু ল্যাটিন অ্যামেরিকায় সবার আগে লকডাইন দিয়েছিল পেরু৷ অথচ এখন সংক্রমণের তালিকায় তার অবস্থান ব্রাজিলের পরেই৷ এমন কেনো? কারণ খুঁজে বের করতে গিয়ে গবেষণায় দেখা গেছে পেরুর ৪৪ শতাংশ মানুষের বাসায় ফ্রিজ নেই৷ ফলে খাবার সংরক্ষণের উপায় না থাকায় তাদের বাইরে বের হতে হয়েছে এবং বাজার থেকে সংক্রমণ ছড়িয়েছে৷ দেশটির ৫৬ শতাংশ মানুষের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই৷ ফলে সরকারের অর্থ সাহায্যের জন্য তাদের সশরীরে ব্যাংকে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে, সেখান থেকে সংক্রমণ ছড়িয়েছে৷ আবার দেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ নিজের বাসায় এক রুমে ৪-৫ জন গাদাগাদি করে থাকতে হয়৷ ফলে বাসার ভেতরেও সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়েছে৷
বাংলাদেশে কী কোনো গবেষণা হয়েছে? ইউরোপকে কপি-পেস্ট না করে বাংলাদেশের বাস্তবতায় কী করা উচিত, সেটা আমরা কারো মুখে শুনেছি? না৷
এবার প্রশ্ন উঠবে বাংলাদেশ টেস্ট এত কম করছে, তাহলে আসল পরিসংখ্যান জানবে কিভাবে? কথা সত্য৷ বাংলাদেশ টেস্ট করার দিক দিয়ে অনেক পিছিয়ে আছে৷ কিন্তু ওয়ার্ল্ডোমিটারের বাকি পরিসংখ্যান দেখুন৷ মোট সুস্থের তালিকায় বাংলাদেশ ১৯ নাম্বারে৷ কিন্তু ক্রিটিক্যাল রোগীর সংখ্যা অনেক কম, তালিকার ১১০ নাম্বারে৷ প্রতি ১০ লাখ মানুষে কতো জন সংক্রমিত হয়েছেন সে তালিকায় বাংলাদেশ ৯১ নাম্বারে৷ প্রতি ১০ লাখে মৃত্যুতে বাংলাদেশ আরো পিছিয়ে ১০৯ নাম্বারে৷ এগুলোও তো দেখা উচিত, তাই না?
কিন্তু আমাদের গবেষকেরা গবেষণা করবেন না, সরকারের দায়িত্বশীলরা বাগাড়ম্বর করে যাবেন, সাংবাদিকরা ভয়ের সংবাদ পরিবেশন করবেন আর জনগণ খুঁজে খুঁজে হতাশ হবেন৷ ভবিষ্যতে যেসব মহামারি আসবে সেগুলোও এভাবেই মোকাবিলা করবো আমরা? ধমক দিয়ে তো আর ভাইরাস ঠেকানো যায় না৷
অনুপম দেব

2021-01-30 06:29:31

ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন: