বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্প বাঁচাতে ভালো নির্বাচন করতে হবে: সিইসি


অনলাইন ডেক্স প্রকাশের সময় : নভেম্বর ২৮, ২০২৩, ৩:২০ অপরাহ্ন
বাংলাদেশের গার্মেন্ট শিল্প বাঁচাতে ভালো নির্বাচন করতে হবে: সিইসি

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ‘বাহিরের থাবা এসেছে’ মন্তব্য করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেছেন, দেশের অর্থনীতি, গার্মেন্ট শিল্প ও ভবিষ্যৎসহ অনেক কিছু বাঁচাতে হলে একটা ভালো নির্বাচন করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। নির্বাচনী প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে গতকাল ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি কমিটির সদস্যদের প্রশিক্ষণের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।

ভোট আয়োজনের নানা পদক্ষেপের মধ্যে বিদেশীদের ‘হস্তক্ষেপ ও তৎপরতা’ দুঃখজনক বাস্তবতা বলে মন্তব্য করেন সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল। তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে আমাদের নির্বাচনে কিন্তু বাহির থেকে থাবা, হাত এসে পড়েছে। তারা থাবা বিস্তার করে রেখেছে। আমাদের অর্থনীতি, আমাদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করতে হলে অর্থাৎ আমাকে বাঁচাতে হলে, জনগণকে বাঁচাতে হলে, তৈরি পোশাক শিল্পকে বাঁচাতে হলে এ নির্বাচনকে ফ্রি, ফেয়ার ও ক্রেডিবল করতে হবে। দেশের জনগণের পাশাপাশি বাইরের ওরা কিন্তু খুব বেশি দাবি করেনি। একটাই দাবি, আসন্ন সাধারণ নির্বাচন ফ্রি, ফেয়ার ও ক্রেডিবল হওয়া লাগবে। এখানে কোনো রকম কারচুপির আশ্রয় নেয়া যাবে না।’

পৃথিবীর কোনো দেশই সোবেরিং স্টেট না মন্তব্য করে সিইসি বলেন, ‘এটাই সত্য, এটা বললে অবশ্য অনেকেই কষ্ট পাবে। “সোবেরিং” এটাও কিন্তু একটি আপেক্ষিক ধারণা। আমাকে যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র নির্দেশ দিতে পারে, আমি কিন্তু সেভাবে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে হুমকি-ধমকি, কমান্ড দিতে পারছি না। এটা একটা বাস্তবতা।’

বিচার বিভাগে কাজ করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘বিচার বিভাগের কাজের সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্বাধীনতা, স্বাধীন সত্তা। সাহস ও স্বাধীনভাবে কাজ করার যে পরিবেশ সেটি তৈরি করা। দেশের মানুষ স্বাধীন রাষ্ট্রীয় কর্মচারী হিসেবে বিচারকদের বিবেচনা করে। এখনো কোনো কিছু হলে বলে যে বিচার বিভাগীয় তদন্ত চাই। অর্থাৎ মানুষের আস্থাটা বিচার বিভাগের ওপর বেশি।’

তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্রকে যদি বাঁচিয়ে রাখতে হয়, তাহলে নির্বাচনকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। নির্বাচন নিয়ে যে বিতর্ক দেশে এখন, সেটি অনাকাঙ্ক্ষিত। নির্বাচনের স্বচ্ছতাকে উপলক্ষ করে আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিভক্ত হয়ে গেছে। সেটি কাঙ্ক্ষিত ছিল না। এজন্যই বলা হয় ক্রেডিবল ইলেকশন। ক্রেডিবল জিনিসটা কিন্তু বিশ্বাসযোগ্যতা। এটা কিন্তু চোখে দেখা যাবে না। তার পরও এটাকে বলা হয় পাবলিক পারসেপশন। নির্বাচন ক্রেডিবল হয়েছে কিনা, ফ্রি হয়েছে কিনা, ফেয়ার হয়েছে কিনা, গোটা পাবলিক পারসেপশন বলে একটি কথা আছে। এটি আমাদের বিশ্বাস করতে হবে। জনগণকে বলতে হবে নির্বাচন ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার হয়েছে। জনগণ যদি বলে, এবারের নির্বাচন ফ্রি, ফেয়ার ও ক্রেডিবল হয়েছে। তাহলে এটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন।’

ভোটে কারচুপির প্রসঙ্গ টেনে এনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘আমরা অতিসম্প্রতি কষ্ট পেয়েছি। ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও লক্ষ্মীপুর, ওখানেও সিল মারা হয়েছে। আমরা সেটাকেও প্রতিহত করতে পারিনি। প্রশাসন পারেনি, আমাদের নির্বাচন কর্মকর্তারা পারেনি। এটা লজ্জাকর। তবে এ সিল মারাটাও আমাদের নির্বাচনের একটা সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে। এটা মন্দ সংস্কৃতি। পেশিশক্তি ও কালো টাকা ব্যবহার করে দীর্ঘদিন ধরে চর্চার মাধ্যমে একটা অপসংস্কৃতি তৈরি করা হয়েছে। ক্রমান্বয়ে আমাদের এ জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আমরা নিরন্তর চেষ্টা করছি, আমরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছি যে নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য করার জন্য কমিশন যথাসাধ্য চেষ্টা করবে। তবে নির্বাচন কমিশন এককভাবে কখনই এটি করতে পারবে না। আপনাদের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। প্রশাসনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। আমরা আশা করব, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবাই চোখ-কান খোলা রেখে সৎভাবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করবে।’

এবারই প্রথম বিচারকদের নিয়ে ৩০০ আসনে ইলেক্টোরাল কমিটি গঠন করেছে ইসি। এ প্রসঙ্গে সিইসি বলেন, ‘আমাদের এবারের অনন্য বৈশিষ্ট্য হচ্ছে ৩০০টি ইলেক্টোরাল কমিটি করা। প্রথমবারের মতো আমাদের সময়ে এটি হয়েছে। এতেই বোঝা যাচ্ছে আমরা কতটা সতর্ক নজর রাখছি। বিচারকরা সাহসী হয়ে এ নজরদারি করতে পারবেন। রাষ্ট্র পরিচালিত হয় বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ আর আইন বিভাগ নিয়ে। সবচেয়ে বড় ভারসাম্যটা তৈরি করে স্বাধীন বিচার বিভাগ। স্বাধীন সত্তাটা যদি অন্তরে গড়ে উঠতে পারে এবং সাহসী হয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারে তাহলে ধীরে ধীরে দেশে ভারসাম্যপূর্ণ শাসন ব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যেটি জনগণ চায়।’

নির্বাচন নিয়ে দেশ একটা সংকটের মধ্যে রয়েছে জানিয়ে হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘দেশ এখন বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচলে আছে। এখান থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। তবে আমেরিকার গণতন্ত্র আড়াইশ বছরের, বিলেতের গণতন্ত্র ৪০০ বছরের। বিলেতের ইতিহাস আরো দেড়-দুই হাজার বছরের, কিন্তু তাদের গণতন্ত্র ৩০০-৪০০ বছর ধরে টিকে আছে। সেদিক থেকে আমাদের গণতন্ত্র নতুন। মাঝে মাঝে সামরিক ধাক্কা, গণঅভ্যুত্থান ইত্যাদি হয়ে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া এখনো স্থিরভাবে ৫০ বছর আমরা পেরোতে পারিনি। আমরা চাইব যেখানে শাসনতন্ত্র আছে, নির্বাচন আছে, গণতন্ত্র আছে, প্রজাতন্ত্রের কথা আছে সেই সংবিধানকে সমুন্নত রাখার দায়িত্ব পালন করতে।’

প্রধান নির্বাচন কমিশনার বলেন, ‘নির্বাচনের দিনটা হচ্ছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এদিন যেটা চাইব, আমরা হয়তো সফল হব কিংবা ব্যর্থ। কিন্তু ব্যর্থ হওয়ার চিন্তা করছি না। আমরা অবশ্যই সফল হব। আমরা দেখতে চাই, যারা ভোটার তারা কেন্দ্রে আসছেন বা আসতে পারছেন, তাদের কেউ পথে বাধা দিচ্ছে না। যদি বাধা দেয়া হয়, তাহলে নির্বাচন প্রভাবিত হয়ে গেল। নির্বাচন অবাধ করতে আমরা দেখতে চাই ভোটাররা লাইন ধরে ভোট দেয়ার জন্য দাঁড়িয়ে আছেন। আরেকটা জিনিস দেখতে চাই, লাইনটা ঘণ্টার পর ঘণ্টা থেমে নেই। যদি থেমে থাকে তাহলে বুঝতে হবে ভেতরে এ কাজ হচ্ছে। লাইনটা চলমান থাকতে হবে। আমি এখান থেকে ৪২ হাজার কেন্দ্র দেখতে পারব না। আপনারাও কেউ দেখতে পারবেন না।’

ভোট শেষে কেন্দ্রে কেন্দ্রে গণনার ঘোষণা করা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সবাই সতর্ক থাকবেন, যেখানে ভোট গণনা করা হয়, সেখানে শুদ্ধভাবে গণনা করা হচ্ছে কিনা। সেখানে কোনো কারচুপির আশ্রয় নেয়া হচ্ছে কিনা। যখন ঘোষণাটা হবে সবাই কিন্তু তার রিসিটটা পাবেন। ফলে এটা নিয়ে কোনো বিতর্কের সুযোগ হবে না। আমরা চাইছি অবিতর্কিত ফলাফল, ফলাফলটা নিয়ে যেন কোনো বিতর্ক না হয়। প্রত্যেকটা কেন্দ্রের ভোট গণনার পর প্রার্থীকেও তার সব কেন্দ্রের প্রাপ্ত ভোট হিসাব করে ফেলতে হবে। তাহলে পরবর্তী সময়ে কোনো অনিয়ম হলে সেটি তিনি চ্যালেঞ্জ করতে পারবেন। এ বিষয়ও সবাইকে দেখতে হবে। বিশেষ করে যারা ক্যামেরা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন, গণমাধ্যমকর্মী, তাদেরও এ দায়িত্ব পালন করতে হবে।’

ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন: