Mohin Arham
Executive Editor
সরকারি অফিস কর্মচারী ‘বহর’ প্রতিবারের মতো এবারও রোজা আসার আগে লম্বা দাড়ির বর্ধিতাংশের রং মিলকরণার্থে নতুন করে মেহেদি চর্চা করেছে। রোজার শুরুতে বেশ খোশমেজাজে অফিস করছে। পিয়নসহ সহকর্মীদের সঙ্গে রোজা, ইবাদত নিয়ে বেশ আলাপচারিতা করে। ক্লায়েন্ট হ্যান্ডলিংয়ে বহর বেশ পারদর্শী, বিশেষত আন্ডার টেবিল হ্যান্ডলিংয়ে সবার চেয়ে পারদর্শী। আর এজন্য অফিসের বড় সাহেবের সঙ্গে তার সম্পর্কটা অপেক্ষাকৃত ভালো। ফলে সহকর্মী ও ক্লায়েন্টদের কাছে তার একটা গুরুত্ব রয়েছে।
ধর্ম, ইবাদত নিয়ে আলোচনায় ওয়ায়েজদের মতো সে বাংলা বলার আগে আরবিতে কেরাত ব্যবহার করে থাকে। রোজার দিন তাই বহর আন্ডার টেবিল/ওভার টেবিল কাজের সঙ্গে সঙ্গে তসবিহ গণনাও করে।
প্রায় দুপুরের দিকে নেয়ামত সাহেব এলেন বহরের কাছে। নেয়ামত সাহেব তার পুরোনো ক্লায়েন্ট। অনেক দিন ধরে আটকে থাকা পাওনার জন্য এ অফিস ও অফিস ঘুরে বেড়াচ্ছেন। বহরই তাঁর শেষ ভরসা—এখানেই আটকে আছে ফাইলটা।
নেয়ামত সাহেবকে দেখে—
বহর: আপনাকে তো রোজার পরে আসতে বলেছিলাম।
নেয়ামত: তা বলেছিলেন, কিন্তু আমার মেয়েটার অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যাচ্ছে। ডাক্তার বলছে, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব অপারেশন করা দরকার।
কথা শুনে বহর উপরে যতটা দুঃখ প্রকাশ করল, মনে মনে তার চেয়ে বেশি খুশি হলো এই ভেবে যে বেশি টাকা আদায়ের সুযোগটা তার জন্য রোজার নেয়ামত হিসেবে এসেছে; পরিবার নিয়ে ঈদটা এবার আরও সচ্ছলভাবে করা যাবে।
বহর: (রঙিন দাড়িতে হাত বুলিয়ে আর তসবিহ জপতে জপতে) রোজা রমজানের দিন, স্যার যে ব্যাপারটা কিভাবে নেবেন…
নেয়ামত: বহর সাহেব, আমি সরকারি অফিসের চাকরি থেকেই অবসর নিয়েছি। অনেক রমজান, জিরো টলারেন্স প্রত্যক্ষ করেছি। কোনো কিছুই থেমে থাকেনি। শুধু ওভার টেবিল কাজ মন্দা, আর সে সুযোগে আন্ডার টেবিল কাজের রেট বেড়েছে। অন্যায় আমরা সবাই করি—কেউ বিপাকে পড়ে, কেউ ইচ্ছে করে। কাজ তো আন্ডার টেবিল ছাড়া হওয়ার নয়। আর আমার মেয়ে অসুস্থ, তাই আমি রেট বাড়িয়ে দিতেও রাজি আছি।
নেয়ামত সাহেবের কথাগুলো বহরের একটু অপমানিত লাগলেও দুধেল গাভীর লাথি হিসেবে মেনে নিল। বহর ভাবছে—এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি। কত দিন ধরে ঘুরছে বিনা টাকায় কাজটা হাসিলের জন্য, আর আজ সে রেট বাড়াতেও রাজি—রমজান কারিম।
কাজটার জন্য বহর যে টাকা দাবি করছে, নেয়ামত সাহেবের কাছে তা অনৈতিকতার সঙ্গে একটু অতিরঞ্জিতও মনে হলো। কিন্তু কী আর করার! চুপ করে থাকলেন তিনি। বহর এ নীরবতাকে সম্মতি ধরে নিল।
বহর: টাকাটা দিন, আমি স্যারের সঙ্গে কথা বলে আসি।
নেয়ামত: এত টাকা তো আমি সঙ্গে নিয়ে আসিনি।
বহর: আরে ধুর মিয়া, কাজ করতে আইছেন, টাকা আনেন নাই!
নেয়ামত: দয়া করে আমার পাওনা টাকা থেকে আপনাদের অংশ রেখে নিয়ে কাজটা করে দিন।
বহর: কত আছে তাই দেন, দেখি স্যারকে বলে কী করা যায়।
অসহায় নেয়ামত সাহেব তাঁর কাছে থাকা সব টাকাই বহরের হাতে তুলে দিলেন। টাকাটা গুনে বহর তার পকেটে রেখে বলল—এতে তো হবে না। আচ্ছা, দেখি কী করা যায়।
মসজিদ থেকে জোহরের আজানের সুর ভেসে আসতেই বহর আজানের জবাব দিতে দিতে টেবিলের ফাইলপত্র গুছাল এবং বলল—চলুন, আগে নামাজ পড়ে আসি। পরে দেখি আপনার জন্য কী করা যায়।
নামাজ পড়তে পড়তে বহর ভাবছে—নেয়ামত যে সমস্যায় পড়েছে, তাতে ভালো একটা অঙ্কই দাবি করা যাবে। না দিয়ে তো আর উপায়ই বা কী! কিন্তু কত দাবি করা যায়? আবার ভাবছে—মসজিদ, মন্দির, মার্কেট—সব জায়গাতেই চোর-ডাকাতের আনাগোনা; তাই বারবার পকেট চেক করে নিচ্ছে বহর।
আজ বহর নফল নামাজ না পড়ে শুধু ফরজ-সুন্নাত পড়েই মসজিদের বাইরে নেয়ামত সাহেবের জন্য অপেক্ষা করছে আর তসবিহ জপছে। অফিসের পিয়ন বহরকে দেখে একটু বিস্মিত—স্যার তো কখনো নফল নামাজ না পড়ে বের হন না। উনি সবসময়ই নফল নামাজ পড়তে বলেন, বিশেষত রমজান মাসে অতিরিক্ত ফজিলতের সুযোগ নেওয়ার বয়ান দেন। কিন্তু আজ তিনি নফল না পড়ে, তা-ও আবার রোজার দিনে—
পিয়ন: স্যার, আজকে নফল না পড়েই বের হয়ে পড়লেন? কোনো সমস্যা?
বহর: না না, কোনো সমস্যা না।
পিয়ন: তয় কি নফল নামাজ পড়বেন?
বহর: (আরও দ্রুত তসবিহ জপতে জপতে) আরে না না।
পিয়ন: তয় চলেন যাই অফিসে।
বহর কিছুটা বিরক্ত হলেও চেপে রেখে বলল—তুমি যাও, আমি আসছি।
অফিসে ফিরে নেয়ামত সাহেবকে বললেন, আপনি একটু বসুন, আমি স্যারের সঙ্গে কথা বলে আসি।
টয়লেট থেকে ঘুরে এসে বহরের দাবি এখন দ্বিগুণ। দাবি শুনে কপাল বেয়ে মাথার ঘাম বের হতে লাগল। মাথা বুকের কাছাকাছি নামিয়ে চুপ করে বসে আছেন নেয়ামত সাহেব।
বহর বললেন, আপনি যদি রাজি থাকেন, তাহলে স্যারকে বলে কাজটা আজই করে দেব। ক্লান্ত নেয়ামত সাহেব মেয়ের অসুস্থতা, আর কোনো উপায় নেই এবং আজই কাজটা হবে—এই আশ্বাসে রাজি হলেন।
নেয়ামত সাহেব একা বহরের রুমে বসে ভাবছেন—এমন একটা সরকারি অফিসে তিনি অনেক বছর কাজ করেছেন। নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কখনো কখনো অনৈতিক কাজ করতে বাধ্য হতেন চাকরি রক্ষার জন্য। মানুষের সমস্যা শুনে সুবিধা নেওয়ার চেয়ে বরং নিজের অংশ ছাড় দিয়ে কাজ করে দিয়েছেন। বহরের মতো কোনো অফিসেই বড় স্যারের প্রিয়পাত্র হয়ে উঠতে পারেননি। চাকরিজীবনে কত অফিসে বদলি হয়েছেন, তা নথি না দেখে মনে করাও কঠিন।
বহর জানে আজ কাজ হবে না; হলেও বহর করবে না। এটা টোপ দিয়ে ক্লায়েন্টকে রাজি করানো বহরের একটা কৌশল। তাছাড়া নামাজের পরে তার আরও একটা ক্লায়েন্টও আসার কথা। আর এত টাকা আজ তার বাসায় নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতিও নেই। অফিসের বেতনটা ব্যাংকে পেলেও আন্ডার টেবিলের ইনকামটা তাকে ক্যাশে নিয়ে যেতে হয়। বহর ভাবছে, এ লেনদেনটাও যদি ব্যাংকের মাধ্যমে হওয়ার ব্যবস্থা থাকত, তাহলে সুবিধা হতো। চারদিকে যে চোর, বাটপার, ছিনতাইকারী, পকেটমার—এদের থেকে নিরাপদ থাকা যেত। বেতনের চেয়ে তো আন্ডার টেবিল লেনদেনই বহুল প্রচলিত। তাহলে এ পেমেন্টটা ব্যাংকের মাধ্যমে হওয়ায় কী আর এত সমস্যা! এ ভেবে বহর মাঝেমধ্যেই বেশ বিরক্তি বোধ করে।
নিরাপত্তার জন্য আপাতত সে নীচপকেটওয়ালা আরবি স্টাইলের একটা জুব্বা—মানে কোমরের দুপাশে দুটো পকেট আর বুকপকেটের নিচে ভেতরের দিকে আরও একটা পকেট—দর্জির কাছ থেকে স্পেশাল অর্ডার দিয়ে বানিয়ে নিয়েছে। ক্যাশ বেশি হলে এ জুব্বায় বহন করতে সুবিধা।
নেয়ামত সাহেবকে আশ্বস্ত করতে বহর বলল, আমি যখন কাজে হাত দিয়েছি, কাজ আপনার হবে। তবে আজ হবে না। কারণ ফাইল রেডি করতে সময় লাগবে, আর স্যারের একটু তাড়া আছে। বুঝেন তো, রোজার দিন স্যার তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরবেন। আপনি কাল আসেন, কাজ হয়ে যাবে ইনশা আল্লাহ। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না।
শুনে নেয়ামত সাহেব একটু হতাশ হলেও কী করার আছে তাঁর! বাসায় ফেরার উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। রাস্তায় এসে মনে হলো, তাঁর কাছে বাসায় ফেরার ভাড়া বাবদ কোনো টাকাই নেই। সবটাই বহর নিয়ে নিয়েছে। অগত্যা বহরের অফিসে ফিরে এলেন, অন্তত ভাড়াটা নেওয়ার জন্য। রুমের সামনে আসতেই শুনলেন, ভেতরে তুমুল বাকবিতণ্ডা চলছে।
বহর বলছে, আমি একজন রোজাদার। আমাকে এভাবে অপমান করা আপনার ঠিক হচ্ছে না।
অন্যজন আরও চিৎকার করে বলছে, রোজা রেখে রোজার দোহাই দিয়ে তুই আমার কাছে বাড়তি ঘুষ চাচ্ছিস! থু থু মারি তোর মতো রোজাদারের মুখে। আমি রোজাদার না, তাই তোর মতো ভণ্ড ধার্মিককে অপমান করতে আমার বাধা নেই। আমি ধর্ম করছি না, কিন্তু আমি তোর মতো ধর্মের সঙ্গে প্রতারণাও করছি না।
সঙ্গে বহরের ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’, ‘নাউযুবিল্লাহ’ শব্দও ভেসে আসছিল। এমন অশ্রাব্য গালাগাল শুনে নেয়ামত সাহেবের বহরের রুমে ঢোকার রুচি হলো না। ভাবছেন, ফিরে যাবেন; কিন্তু বাসায় যাবেন কীভাবে? আরও ভাবছেন, কার ওপর ভরসা করছেন তিনি—বহর আদৌ কাজ করবে কি? আগামীকাল আসলে যদি টাকা আরও বাড়িয়ে চায়? ভাবছেন, টাকাটাই তিনি ফেরত চাইবেন। দরকার নেই কাজের।
এরই মধ্যে শুনলেন—আমি আগামীকাল আসব। আমার কাজ যদি রেডি না হয়, আমি তোর রঙিন দাড়ি ছিঁড়ে ফেলব। এ পবিত্র দাড়ি তোর মতো ঘুষখোরের মুখে মানায় না।
দরজা খুলেই হন হন করে বেরিয়ে গেল এক সুঠামদেহী যুবক।
নেয়ামত সাহেব রুমে ঢুকতেই বহর তার সদ্য মলিন চেহারায় একটু হাসি এনে চেহারাটাকে স্বাভাবিক করার ব্যর্থ চেষ্টা করল।
বহর: আরে নেয়ামত সাহেব, আপনি এখনো এখানে?
নেয়ামত: জি, আপনার অন্য ক্লায়েন্ট ছিল, তাই রুমে ঢুকিনি।
বহর: আর বলবেন না। মানুষের উপকার করলে যা হয়! যত উপকার করি, ততই অনুনয়-বিনয় বেড়ে যায়—এই আরকি। সে যাক, তো আপনি আবার কী মনে করে?
নেয়ামত: ভাবছি, আমি কাজটা করব না। আপনি আমার টাকাটা ফেরত দিয়ে দিন।
বহরের যেন মাথায় বাজ পড়ল। বউয়ের জন্য শাড়ি, গহনা, ঈদের বাজার—সব স্বপ্ন তার খানখান হতে লাগল; সঙ্গে বসের রক্তচক্ষু… এক্ষুনি একজন এত হুমকি-ধমকি দিয়ে গেল…
বহর ভাবছে—সে যাহোক, আমি রোজাদার। আমাকে সংযমী হতেই হবে। আল্লাহু আকবার, রমজান কারিম…
বহর: আরে, টাকা ফেরত নেবেন—সে তো সমস্যা না। কিন্তু টাকা তো স্যারের কাছে।
নেয়ামত: আমি অপেক্ষা করছি। আপনি টাকাটা ফেরত নিয়ে আসেন।
বহর: স্যার তো বাসায় চলে গেছেন। আরে নেয়ামত সাহেব, আল্লাহকে ডাকুন। আমাদের ওপর ভরসা রাখুন। ধরে নেন, আপনার কাজটা হয়ে গেছে। এত চিন্তা না করে এখন বাসায় যান তো। আপনার অসুস্থ মেয়ে নিয়ে ভাবুন।
নেয়ামত: বাসায় যাওয়ার ভাড়াটাও আমার কাছে নেই, বহর সাহেব।
বহর একটু শব্দ করে হাসি দিয়ে বলল—আচ্ছা, আপনার ভাড়ার টাকা দরকার। এতটুকু উপকার তো আপনাকে করাই যায়। মানুষের উপকার করাই তো আমাদের কাজ।
বলতে বলতে পকেটে হাত ঢুকিয়ে নেয়ামত সাহেবের দেওয়া টাকাটাই বের করতে গিয়ে মনে পড়ল—এই টাকা তো বসের কাছে! ধুর, কী যে হলো! একটু আগে অন্য ক্লায়েন্টের হুমকি-ধমকি, নেয়ামত সাহেবের টাকা ফেরত চাওয়া, তার ওপর রোজাদার বহরের পড়ন্ত বেলা—বহর কিছুটা বেসামাল হয়ে পড়েছে।
নিজেকে সামলে বহর অন্য পকেট থেকে কিছু টাকা বের করে নেয়ামত সাহেবকে দিয়ে বলল—কাল ফেরত দিয়ে দেবেন।
নেয়ামত: জি, দেব। বড্ড উপকার করলেন। আপনাদের মতো উপকার করার সৌভাগ্য কতজনের হয়, বলুন!
বহর: সব আল্লাহর রহমত আর আপনাদের দোয়া আর কী।
বহর ভাবছে, কাজ অনেক হয়েছে—এবার বউকে ফোন দিয়ে একটু খুশি করা যাক। ফোন হাতে নিয়ে ডায়াল করতেই বিজি টোন বাজছে। বহর কিছুটা বিরক্ত হয়ে বিড়বিড় করছে—রোজা রমজানের দিনেও বউয়ের আড্ডা মারার কমতি নেই। নাহ্, গজব-টজব পড়ে সোশ্যাল মিডিয়া ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত বউয়ের আড্ডা বন্ধ হবে না। ঠিক আছে, ও আড্ডা মারুক। আমি বরং মাকে একটা ফোন দিই। কত দিন মায়ের খোঁজখবর নেওয়া হয় না। এবার ঈদে মাকেও একটা কাপড় কিনে দেব। সুখবরটা মাকে না হয় দিয়েই দিই।
বহর মাকে ডায়াল করতে করতেই বউয়ের কল-ব্যাকের রিং বেজে উঠল। ফোন রিসিভ করে বহর বলল, হ্যালো বৌমা…
বহরের বউ চিৎকার করে বলল, এই! তুমি আমাকে বৌ-মা বলছো কেন?
চিৎকার শুনে বহরের কান থেকে ফোন ছিটকে টেবিলের ওপর পড়ে গেল। বহর নিজেকে সামলে ফোন তুলে বেশ নরম সুরে বলল, আর বলো না বৌজানু, কাজের এত চাপ! অফিসের সবার সমস্যা তো আমাকেই দেখতে হয়, তার ওপর রোজার দিন… যাক, বাদ দাও ওসব, জানু।
বহর সুরটা আরও নরম করে আদুরে গলায়—
বহর: বৌজানু, একটা সুখবর আছে।
বউ: কী সুখবর গো?
বহর: না, এখন না। বাসায় এসে বলব।
বউ: না না জান, তুমি এখনই বলো।
বহর: না জানু, বাসায় এসে তোমাকে আদর করতে করতে বলব।
বউ: আচ্ছা ঠিক আছে, আমার একটা কল এসেছে—একটু ধরি…
বহরের ফোনে ডিসকানেক্ট সিগন্যাল বাজছে। বিরক্ত হয়ে বহর ভাবছে—আমার সুখবরের চেয়ে ওর কাছে অন্যের ফোন বেশি জরুরি! কোথায় আমাকে একটু আদর করে তাড়াতাড়ি বাসায় যেতে বলবে…
বহর অপেক্ষাকৃত একটু উচ্চ স্বরে পিয়নকে ডাকতে ডাকতে ব্যাগ গুছাতে লাগল। পিয়ন আসতেই বহর ধমকের সুরে এক নিঃশ্বাসে বলল, কোথায় থাকো? এত ডাকাডাকি করতে হয় কেন? আমি বাসায় যাচ্ছি।
পিয়ন দেয়ালের ঘড়ি দেখে বলল, স্যার, এত তাড়াতাড়ি?
বহর স্বরটা আরও একটু উঁচিয়ে বলল, হ্যাঁ, তোমার কোনো সমস্যা?
পিয়ন বলল, না স্যার, আপনি রোজাদার।
বহর এবার স্বর আরও উঁচিয়ে বলল, তো কী হয়েছে?
পিয়ন বলল, না স্যার, আপনি তো বলেন রোজায় সংযমী হতে—আর আমিও রোজাদার।
“খুব বেশি কথা শিখে গেছো তুমি”—বলে বহর হন হন করে বেরিয়ে পড়ল।
বাসায় যেতে যেতে বহর ভাবছে—আজ বউয়ের সঙ্গে একটা রফাদফা করতে হবে। অফিসের আন্ডার টেবিল/ওভার টেবিলের কত টাকাই আমি তার পেছনে খরচ করি! এজন্য আমি আমার মা-বোনের দেখাশোনাটাও ঠিকমতো করি না। আজ এ শাড়ি, কাল ও গহনা—শ্বশুরবাড়ির আবদার, কী না করছি আমি…
বাসার কাছাকাছি আসতেই বহর ভাবল—রোজা রমজানের দিন, সংযমী হতে হবে। তাছাড়া সুখবরটা মাটি করা ঠিক হবে না।
দরজার বেল টিং টং করে বেজে উঠতেই বহরের বউ তাড়াতাড়ি মাথার চুল ঠিকঠাক করে দরজা খুলল। বহর হাতের ব্যাগটা সোফায় ছুড়ে মেরে বউকে জাপটে ধরল।
বউও বহরকে জড়িয়ে ধরে হাত দুটো ধীরে ধীরে নিচে নামাতে নামাতে বহরের গায়ের জুব্বার নিচপকেট পর্যন্ত পৌঁছে বলল—হুম, বুঝেছি তোমার সুখবর।
বহর বউকে জড়িয়ে সোফায় বসিয়ে বলল—এ তো মাত্র স্যাম্পল। আসল সুখবর হবে আগামীকাল।
শুনে বহরের বউয়ের চোখ দুটোর সঙ্গে সঙ্গে ঠোঁটেরও আকার বাড়ল। আবেগে সে বহরকে আরও জোরে জড়িয়ে ধরে কোমল থুতনিটা বহরের ঘাড়ের পেছনে নুইয়ে দিল।
বহর বউয়ের দু’কানের ওপর আলতো করে হাত রেখে মাথাটা সামনে টেনে দুটো মুখ কাছাকাছি আনার চেষ্টা করতেই বউ বলল, কী করছো? রোজা তো।
বহর কিছুটা নিরাশ হয়ে দমে গেল। বউকে পাশে বসিয়ে হাতে আদর করতে করতে—
বহর: শোনো জানু, আগামীকাল কিন্তু অফিসে পরতে আমাকে নিচপকেটের জুব্বাটা দেবে।
বউ: সেটা তোমাকে বলতে হবে না জান। ওটা আমি ধুয়ে ইস্ত্রি করে একদম রেডি করে রেখেছি।
বহর তার বউয়ের নাক চেপে হালকা ঝাঁকুনি দিয়ে আবার কাছে টানার চেষ্টা করতেই বউ দুহাত বহরের বুকের ওপর রেখে দূরত্ব রাখার চেষ্টা করতে করতে বলল—কি করছো? তুমি কি রোজা ভুলে গেছো?
বহর ইন্নালিল্লাহ, বিসমিল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ, নাউযুবিল্লাহ—সব একসঙ্গে বলে বউকে ছেড়ে দিয়ে বলল—নাহ্, শয়তান আসর করেছে। তাড়াতাড়ি নফল নামাজ পড়তে হবে। জানু, তুমিও পড়ে নাও।
বহর সাধারণত ফজর নামাজের পরে একটু ঘুম দিয়ে উঠে নফল নামাজ পড়ে অফিসে যায়। অফিসে পৌঁছতে দেরি হলেও কোনো সমস্যা নেই, বিশেষত বহরের। আজ নামাজের পরে বহর ঘুমায়নি, শুধু অফিসে যাওয়ার অপেক্ষা। নিচপকেটের জুব্বা পরে বহর আজ পিয়নেরও আগে অফিসে চলে এসেছে। এদিক-সেদিক ছোটাছুটি করে নেয়ামত সাহেবের কাজ রেডি করছে, যাতে নেয়ামত সাহেব আজ আবার টাকা ফেরত চাওয়ার সুযোগ না পান। তাছাড়া ওই ঘাড়ত্যাড়াও আবার আজ আসবে বলেছে। নেয়ামত সাহেবের কাজটা সেরেই আজ অফিস ছাড়ার পরিকল্পনা বহরের।
কাজ মোটামুটি শেষ, স্যারের স্বাক্ষরটাই শুধু বাকি। এটা নিয়ে বহর কিছুটা উদ্বিগ্ন—স্যার না আবার অফিসে আসতে আজ খুব বেশি দেরি করেন। এরই মধ্যে কয়েকবার বহর স্যারের রুমে উঁকি মেরে এসে পিয়নকে বলে রেখেছে—স্যার আসলেই জানাতে। নেয়ামত সাহেব না আবার দেরি করেন, এটা নিয়েও বহরের আরেক টেনশন।
স্যার আসার পরে স্বাক্ষর নিয়ে সব কাজ সেরে অফিসের ভাগ-বাটোয়ারাও মিটিয়ে ফেলেছে বহর। অপেক্ষা শুধু নেয়ামত সাহেবের।
নেয়ামত সাহেব এখনো আসছেন না। এদিকে ওই ঘাড়ত্যাড়াও যে কোনো সময় চলে আসতে পারে। আর দেরি করা যায় না। নেয়ামত সাহেব না হয় এসে ঘুরে যাবে, পরের দিন আসবে—ভেবে বহর টাকাগুলো ভাগ করে জুব্বার কোমরের কাছের ও বুকের নিচপকেটে রাখল, আর ভাড়ার জন্য বুকের ওপরের পকেটে কিছু টাকা নিল। ব্যাগ গেলে সব যাবে—তাই ছিনতাইকারীর ভয়ে বহর ব্যাগে টাকা রাখে না।
বাসায় যাওয়ার জন্য বেরিয়ে পড়ল বহর। পিয়নকে বলল না, কারণ ও ব্যাটা বড় বেশি কথা শিখে গেছে। স্যার ম্যানেজ—তাই অফিসে কে জানল, না জানল, তা নিয়ে পরোয়া নেই বহরের।
অফিস থেকে বেরিয়ে বহর ভাবছে—এত টাকা নিয়ে কীভাবে যাওয়া ঠিক হবে? বাস না সিএনজি? ট্যাক্সি তো নয়ই—কে জানে ড্রাইভার কোথায় দলবল নিয়ে ছিনতাই করে! সিএনজিতেও একই সমস্যা। বাসই অপেক্ষাকৃত নিরাপদ—অনেক লোক থাকে। পকেটমারের ভয় থাকলেও ছিনতাইয়ের ভয় কম। পকেটমার তো শুধু টাকা নেয়, তাও চুরি করে। ছিনতাইকারী তো পরনের কাপড় পর্যন্ত খুলে নেয়, তাও আবার জোর করে—বড্ড বেদরদ ছিনতাইকারী গোছের। কবে যে এদের স্বভাবটা একটু ভালো হবে!—এসব ভেবে বাসে উঠে পড়ল বহর।
ড্রাইভারের কাছাকাছি একটা সিটে বসে জুব্বার ডান পকেট টেনে দু’পায়ের চাপে নিয়ে, আর বাম পকেট বাম হাতে চেপে ধরে ডান হাতে তসবিহ জপতে জপতে বহর ভাবছে—পকেটমাররা এত পটু! কখন যে কীভাবে কী করে! রোজা রমজানের দিনে ছিনতাই, পকেটমারি—একটুও কমার লক্ষণ নেই। তাই বুকের নিচপকেটের প্রতিও সচেতনতার কমতি নেই বহরের।
বাসের গতি আর কয়টা বাসস্টপ পরেই বহরের স্টপ—সে হিসাবের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে বহরের তসবিহ জপা।
হঠাৎ “পকেটমার! পকেটমার!” চিৎকার ভেসে এলো বহরের কানে। বুকটা ধক করে উঠল। পা দুটো, বাম হাত আর তসবিহ জপা বন্ধ করে ডান হাতে বুকপকেট দুটোসহ সব পকেট আরও জোরে চেপে ধরে মুখে যে দোয়া আসছে, সেটাই পড়তে লাগল বহর। প্রাইভেট পার্টে একটু ব্যথা অনুভব করল বহর—তা করুক, কিন্তু এই মুহূর্তে চাপ কমানো ঠিক হবে না।
তার পকেটগুলো ঠিক আছে অনুধাবন করে বুকের ধকধকানিটা একটু কমার পরে মনে পড়ল—বিপদে-আপদে দোয়া ইউনুস পড়তে হয়। তাই শুরু করল। দোয়া পড়তে পড়তে দেখে বাসের মাঝবরাবর যাত্রীরা জটলা বেঁধে পকেটমারকে ধরে মারছে।
যাক, ব্যাটা চোর ধরা পড়েছে দেখে বুকের ধকধকানি আরও কমে মনে মনে একটু পুলক অনুভব করছে বহর। এবার ভাবছে—ব্যাটা চোরটাকে নিজে একটা মার দিতে পারলে মনটা একটু শান্তি পাবে।
বহর জুব্বাটা একটু উঁচিয়ে বুকপকেট দুটো থুতনির নিচে চেপে দাড়ি দিয়ে ঢেকে দিল, আর দুই হাতে পাশের দুই পকেট চেপে ধরে বীরদর্পে এগিয়ে গেল পকেটমারের দিকে।
তার দু’হাতই পকেট সামলাতে ব্যস্ত, তাই হাত দিয়ে মারার উপায় নেই। ডান পা তুলে কষে লাথি মারতে গিয়ে মনে হলো—ডান পায়ে চোর মারা ঠিক হবে না, বাম পায়ে মারা উত্তম। দ্রুত ডান-বাম সিদ্ধান্ত বদলাতে গিয়ে শরীরটা হালকা নাচুনি দেওয়ায় বহর শরীর সামলাতে পারল না—ধপাস করে চিৎ হয়ে বাসের মেঝেতে পড়ে গেল।
জটলা এখন বহরের দিকে। পায়ের পর পা বহরের শরীরের ওপর। কেউ ভাবছে পকেটমারের দলের আরেকজন—তাই কিল, ঘুষি, লাথি সবই বহরের শরীরে জুটছে। উঠে দাঁড়ানোর জো নেই। তাই বহর দ্রুত জুব্বার বাম পকেটটা শরীরের নিচে গুঁজে, মুক্ত বাম হাতে বুকপকেট চেপে ধরে উপুড় হওয়ার চেষ্টা করছে।
তসবিহের দানাগুলো টিকটিক শব্দ করতে করতে বাসের মেঝে আর সিটের নিচে গড়িয়ে গেল। এখন কোন দোয়া পড়তে হবে—কোনো দোয়াই তার মনে পড়ছে না। অনেক চেষ্টার পর “লা ইলাহা” পর্যন্ত মুখে এলো, কিন্তু এর পরের অংশ কিছুতেই মনে করতে পারছে না। ভাঙা রেকর্ডের মতো বহর বারবার “লা ইলাহা… লা ইলাহা…” বলতে লাগল।
এ শুনে কেউ কেউ আবার “ভূতের মুখে রাম নাম!” বলে কিল-ঘুষি-লাথির তীব্রতা আরও বাড়িয়ে দিল।
বহরের বুক চেপে ধরা দেখে জটলার কেউ কেউ ভাবছে—বুকে ব্যথা, হয়তো হার্ট অ্যাটাক করেছে। বহর উপুড় হওয়ার চেষ্টা করছে, আর জটলা তাকে চিৎ করে শোয়ানোর চেষ্টা করছে সিপিআর দেওয়ার জন্য। বহর ভাবছে—তার পকেটগুলো রক্ষার্থে যদি আরেকটা হাত থাকত!
অনেক চেষ্টার পরে বহর বোঝাতে সক্ষম হলো—সেও পকেটমারদের ওপর যথেষ্ট বিরক্ত, তাই রাগ মেটাতে এসে এ বিপত্তি ঘটেছে। তার বুকে কোনো ব্যথা নেই, সে ঠিক আছে।
জটলা যখন বহরকে নিয়ে ব্যস্ত, সে সুযোগে পকেটমার সটকে পড়ার সুযোগ পেয়ে গেল।
বাসায় ঢুকতেই বহরের বউ চিৎকার করে বলল—এ কী অবস্থা তোমার! টাকা হারাওনি তো?
বলেই জুব্বার পকেট হাতাতে লাগল। সব পকেটের টাকা বাসায় এসেছে নিশ্চিত হয়ে বহরকে ধরে সোফায় বসাল।
বলল—তোমার কিছু করতে হবে না। তুমি রেস্ট নাও। জুতা, জামা-কাপড় সব আমি খুলে দিচ্ছি।
বউয়ের নতুন সেবার আরাম নিতে বহর সোফার ওপর ক্লান্ত শরীরটা একেবারে নুইয়ে দিল। বউ সব পকেট খালি করতে করতে আর জুতা, কাপড় খুলতে খুলতে বলল, আল্লাহর কাছে হাজার শুকর, তুমি টাকাগুলো সহিসালামতে বাসায় নিয়ে আসতে পেরেছ।
বহর বউয়ের কথায় কর্ণপাত করার চেয়ে “আহ্, উহ্” শব্দ করে শরীরের ব্যথার ভোগান্তিটা প্রকাশ করতে থাকল।
বউ বলল, আহারে! তোমার শরীরে তো দেখি দাগ পড়ে আছে। আমি গরম পানির সেঁক দিয়ে দিচ্ছি। না হলে তো তুমি আগামীকাল অফিসেই যেতে পারবে না।
কথা শুনে বহর ভাবছে—অফিসে না গেলে তো সোশ্যাল মিডিয়ার আড্ডার ব্যাঘাত হবে, সেটা কি আমি বুঝি না?—কিন্তু এসব বলে এখন বহর এমন নতুন নতুন আরামদায়ক সেবা থেকে বঞ্চিত হতে চাইল না।
সেঁক দিতে দিতে বউ বলল, আমি ভাবছি মসজিদে কিছু ইফতারি দেব আর হুজুরকে বাসায় ডেকে মিলাদ পড়িয়ে দেব।
এবার বহর একটু চাঙ্গা হয়ে বলল, এটা একটা ঠিক কথা বলছ। আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জানানো অবশ্যই দরকার। রোজার মাসের ফজিলতের মধ্যেই করা ভালো।
বলেই বহর ভাবছে—এতটা চাঙ্গা দেখানো ঠিক হচ্ছে না। বউ যদি ঘটনা জিজ্ঞেস করে! এতগুলো টাকা নিয়ে চোর মারতে যাওয়ার ঘটনা শুনলে বউ গরম পানির সেঁকের বদলে গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দিয়ে দেবে।
বহর আবার “আহ্, উহ্” শব্দ করতে থাকল।
আহ্-উহ্ শুনে বউ বলল, তুমি এখন রেস্ট নাও, একটু ঘুমাতে চেষ্টা করো। আর মসজিদে গিয়ে আজই হুজুরকে মিলাদের দাওয়াতটা দিয়ে এসো।
টাকাটা যখন বাসায় এসেছে, বউ আর ঘটনা জানার এতটা কৌতূহল দেখাল না।
পরের দিন বহর অফিসে গিয়ে দেখে নেয়ামত সাহেব তার রুমে অপেক্ষা করছেন।
বহর: আসতে এত দেরি করলেন যে! আপনার সব কাজ গতকালই শেষ করে দিয়েছি। আগের ভাড়ার টাকাটা এনেছেন?
নেয়ামত: জি, আপনার ভাড়ার টাকাটা কি আর আমি ভুল করতে পারি? এই নিন আপনার টাকা।
বহর: নেয়ামত সাহেব, আপনার এত বড় একটা কাজ করে দিলাম—আপনি খুশি হননি?
নেয়ামত: আপনি কি আরও বকশিশ চাইছেন?
বহর: আরে না না, অতটা লোভী আমি না। আরে, আপনার মেয়ে তো আমারও মেয়ে। আপনার সমস্যা আমি দেখব না—এটা কি হয়? এই নিন, এখানে একটা স্বাক্ষর করুন। সরকারি বেতন-পেনশনের ওপর ভরসা করে থাকলে কি হয়? নিজের ব্যবস্থা নিজেকেই করে নিতে হয়।
নেয়ামত: সেদিন আপনি আমার টাকাটা ফেরত দিলে আমি আর আসতাম না।
বহর: টাকা তো আর ফেরত পাবেন না, কাজ তো আপনাকে করে দিয়েছি। দেখুন, মানুষের সমস্যায় আল্লাহ কোনো না কোনো ব্যবস্থা করে দেন। এই যেমন আপনার সমাধান হলো।
নেয়ামত: আমি টাকা ফেরত নিতে আসিনি, অনুশোচনা করতে এসেছি, বহর সাহেব। মানুষের সমস্যা আল্লাহ করে দিলে মানুষ কেন আটকে রাখে?
বহর: আল্লাহু আকবার, রমজানুল কারিম! এসব কী বলছেন আপনি, নেয়ামত সাহেব?
নেয়ামত: আল্লাহ যদি ব্যবস্থা করেন, তবে বেতন-ভাতার বাইরে ব্যবস্থা করতে হবে কেন? আমার মেয়ের টেস্ট রিপোর্ট চলে আসায় গতকাল ডাক্তারের ফোন পেয়ে চেম্বারে গিয়েছিলাম, তাই এখানে আসতে দেরি হয়েছিল। এসে দেখি আপনি চলে গেছেন। আপনাদের লোভ, প্রতারণা, ছলচাতুরির কারণে আমার মেয়ের চিকিৎসা বিলম্বিত হওয়ায় সে আজ মৃত্যুপথযাত্রী। তার আর চিকিৎসার দরকার নেই।
বহর: ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
নেয়ামত: আমার মেয়ে এখনো মরেনি, বহর। সে আজ মৃত্যুপথযাত্রী।
বহর: আমি দুঃখিত, নেয়ামত সাহেব। মৃত্যুপথযাত্রী তো আমরা সবাই—আগে বা পরে। সবই আল্লাহর ইচ্ছা। ধৈর্য ধরুন, দোয়া করুন।
নেয়ামত: বহর সাহেব, মৃত্যুর ভয় থেকে লোভ-লালসা আপনাদের অনেক বেশি। মুখে রঙিন দাড়ি, রোজা রেখেছেন, ঘুষের টাকা পকেটে নিয়ে নামাজ পড়ছেন। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ায় আর আপনাদের চক্করে পড়ে ঘুষ দিয়ে আমি অন্যায় করেছি। আমার এ বাকি টাকাটা দিয়ে আমি একটা ফান্ড করে দেব, যাতে সরকারি পেনশনের বিলম্বে কারও চিকিৎসা বিলম্বিত না হয়। এই উছিলায় আল্লাহ হয়তো আমার অনিচ্ছাকৃত ভুল ক্ষমা করে দিতে পারেন।
কতটা অর্থলোভী পিশাচ হলে মানুষ ঘুষ নেয়, আবার ধর্মকর্মের নামে প্রতারণা করে! সেদিনের ওই যুবক যদি ফিরে এসে আপনার মুখের ওই রঙিন দাড়ি ছিঁড়ে ফেলে, তাহলে সেটাও তো আল্লাহর ইচ্ছেতেই হবে। আল্লাহ কি ফিরাবেন? আপনারা কি আপনাদের কৃতকর্মের ভুক্তভোগীর সংখ্যা জানেন? কতজনের থেকে পালিয়ে বেড়াবেন আপনারা? কিসের ভিত্তিতে মাফের আশা করেন? ভুক্তভোগীরা মাফ না করলে আল্লাহ কি মাফ করবেন?
সামান্য আবেগতাড়িত হয়ে বহর ওই যুবকের কথা ভুলে গিয়েছিল। এখন ভাবছে—সংখ্যা তো আসলেই জানি না। ওই ঘাড়ত্যাড়া যদি চলে আসে… আরও লোক নিয়ে এলে… দাড়িসহ আরও কত কিছুই না খোয়া যায়!
বহর: নেয়ামত সাহেব, আমার একটু তাড়া আছে—
বলে রুম থেকে বের হয়ে গেল বহর।
“আমার মেয়ের এ অবস্থার জন্য আপনারা দায়ী, বহর—আল্লাহ না!” বলতে বলতে হাউমাউ করে কাঁদছেন নেয়ামত সাহেব।




































আপনার মতামত লিখুন :